ফারিদ উজ জামানঃ
৫ জুলাই ২০২৫, শুক্রবার। ঢাকার বারিধারা জামিয়া মাদানিয়া মসজিদে অনুষ্ঠিত এক দোয়া মাহফিলে হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের (UNHRC) কোনো অফিস স্থাপন করতে দেওয়া হবে না। তিনি দাবি করেন, এটি দেশের “সার্বভৌমত্ব” এবং “ইসলাম ধর্মের অস্তিত্বের” বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।
এই বক্তব্য শুধু একটি মত প্রকাশ নয়; এটি উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত থাকার এক নির্লজ্জ প্রচেষ্টা। হেফাজতের এই বক্তব্য আসলে সেই পুরনো ন্যারেটিভের অংশ, যেখানে মানবাধিকার, নারী অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা সবকিছুই তথাকথিত ইসলামি “মূল্যবোধের বিরুদ্ধে” বলে চিত্রিত করা হয়।
এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার—বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূলনীতি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবাধিকার। অথচ আজ যখন একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অফিস খুলতে চায়—তাকে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের প্রধান কাজ হচ্ছে:
- নাগরিকদের অধিকার পর্যবেক্ষণ করা,
- রাজনৈতিক নিপীড়ন বা গুম-হত্যার মতো ঘটনা নথিভুক্ত করা,
- ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এখন প্রশ্ন, হেফাজত কেন এতটা উদ্বিগ্ন? তাদের উদ্বেগের কারণ একটাই—তারা জানে, তাদের কর্মকাণ্ড, বক্তব্য, এবং প্রভাব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে দাঁড়াতে পারবে না। তারা চায় না বাংলাদেশে কোনো আন্তর্জাতিক নজরদারি থাকুক, যাতে ধর্মীয় উগ্রতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন বা নারী বিদ্বেষের চিত্র বিশ্বের সামনে প্রকাশ না পায়।
অবাক করার বিষয় হলো, সরকার এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব। অথচ হেফাজতের এই বক্তব্য শুধু জাতিসংঘ নয়, বাংলাদেশের সংবিধানের বিরুদ্ধেও। সরকার কি আদৌ সংবিধান রক্ষা করতে ইচ্ছুক? নাকি উগ্র শক্তির সঙ্গে চুপিচুপি বোঝাপড়া করছে?
আমরা যারা ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবতা ও মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করি, তাদের এখনই সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের অফিস স্থাপন শুধু আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী, যেখানে নিপীড়িতরা আশ্রয় পেতে পারে, এবং রাষ্ট্রকে কিছুটা হলেও জবাবদিহিতার মধ্যে রাখা যায়। হেফাজতের এই বিরোধিতা শুধু একটি অফিসের বিরুদ্ধে নয়—এটি আমাদের বাক-স্বাধীনতা, মানবিকতা এবং জাতীয় ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা এক নীরব যুদ্ধ।