নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আবারও গভীর হুমকির মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে “সংবাদ ৭১”, “বরিশাল মেট্রো” এবং “DSF NEWS”-এ ধর্মীয় উগ্রতা, মৌলবাদ, নারী অধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ে সমালোচনামূলক নিবন্ধ লেখার পর চারজন লেখক ও তাদের পরিবার ভয়ঙ্কর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এ ঘটনার পর সারা দেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে, আতঙ্কে রয়েছেন লেখক, সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিকরা।
লেখক মোহাম্মদ রুম্মান হোসেন (২৭), মোঃ তারিকুল ইসলাম (২৬), ফরিদ উজ জামান (২৫) এবং সুমাইয়া শিমু (২৯) তাদের কলম দিয়ে যা লিখেছিলেন, তা ছিল সমাজের নানা অসঙ্গতি, ধর্মের নামে সহিংসতা এবং মৌলবাদকে ঘিরে। কিন্তু সেই লেখার মাশুল তাদের দিতে হচ্ছে রক্ত আর আতঙ্ক দিয়ে। এই চারজনের আর্টিকেলগুলো গত মার্চ ২০২৫ থেকে জুন ২০২৫ মধ্যে বিভিন্ন অনলাইন নিউজপেপারে প্রকাশিত হয়। ১৯ এপ্রিল “DSF NEWS”-এ মোঃ তারিকুল ইসলাম এর “আমি ছিলাম আওয়ামী লীগের, কিন্তু এখন দেশকে আর চিনি না” শিরোনামের নিবন্ধে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে সরে যাওয়া ও মৌলবাদীদের সাথে আপসের প্রবণতা নিয়ে সরাসরি সমালোচনা করেন। মার্চের ২০ তারিখে “বরিশাল মেট্রো”-তে প্রকাশিত নিবন্ধে সুমাইয়া শিমু বাংলাদেশের তালেবানি ধাঁচের উগ্রপন্থার ক্রমবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জুন মাসে “সংবাদ ৭১”-এ ফারিদ উজ জামান ও মোহাম্মদ রুম্মান হোসেন ইসলামী রাজনীতি ও ধর্মীয় কুসংস্কার নিয়ে ধারাবাহিক দুটি নিবন্ধ লেখেন।
এই আর্টিকেলগুলো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হলে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা খুঁজতে শুরু করে কারা এই লেখাগুলো লিখেছে। বাজারে, মসজিদে, দোকানে দোকানে ঘুরে খোঁজ নিতে থাকে তাদের বাসার ঠিকানা আর মোবাইল নম্বর। যে কোনো মূল্যে তাদের খুঁজে বের করে ‘শাস্তি’ দেওয়ার হুমকি দিতে থাকে।
বরিশালে সুমাইয়া শিমুর বাড়িতে হামলা, গুরুতর আহত তার বাবা
২৪ মার্চ ২০২৫, বরিশালের একটি আবাসিক এলাকায় লেখিকা সুমাইয়া শিমু-এর বাড়িতে মধ্যরাতে হামলা চালায় প্রায় এক ডজন চরমপন্থী। স্থানীয়রা জানান, হামলাকারীরা প্রথমে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে সুমাইয়া শিমুর বাড়ি নিশ্চিত করে, তারপর আচমকা তার বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। সুমাইয়ার বাবা বাধা দিতে গেলে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়, মাথায় লোহার রডের আঘাত লেগে তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। চোখের পানি মুছতে মুছতে সুমাইয়ার মা বলেন, “আমার মেয়ে লিখেছিল কেবল আমাদের সমাজের জন্য। সেটা যে এত বড় অপরাধ হবে, ভাবতেও পারিনি। আজ সুমাইয়ার বাবা হাসপাতালের বেডে।”
মোহাম্মদ রুম্মান হোসেনের লক্ষীপুর এর বাড়িতে হামলা, দেয়ালে মৃত্যুহুমকির বার্তা
১ জুলাই ২০২৫, ঢাকার উপকণ্ঠে লেখক মোহাম্মদ রুম্মান হোসেন-এর বাড়িতে একদল মুখোশধারী উগ্রপন্থী হানা দেয়। “সংবাদ ৭১”-এ প্রকাশিত তার প্রবন্ধে মৌলবাদী রাজনীতির নিন্দা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পতন নিয়ে লেখা হয়েছিল, যা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেই ক্ষোভে সন্ত্রাসীরা তার বাড়ির জানালা-দরজা ভেঙে দেয়, বাড়ির দেয়ালে বড় করে লিখে যায়- “তোকে পেলে গলা কেটে দেবো।
আকন্দবাড়িয়ায় ফারিদ উজ জামানের বাড়িতে তাণ্ডব
২ জুলাই ২০২৫, ঝিনাইদহ জেলার আকন্দবাড়িয়া গ্রামে “সংবাদ ৭১”-তে লেখা আর্টিকেলের কারণে ফারিদ উজ জামান-এর বাড়ি চরমপন্থীদের হামলার শিকার হয়। রাতের আঁধারে হামলাকারীরা বাড়িতে ঢুকে আসবাবপত্র ভেঙে ফেলে এবং পরিবারকে হত্যার হুমকি দিয়ে যায়। তাদের মুখ থেকে বারবার শোনা যায়, “লিখেছিস? এবার তোর গলা কেটে কোরবানি দিব।” স্থানীয় বাজার থেকে দোকান, মসজিদের বারান্দা- সর্বত্র ঘুরে চরমপন্থীরা এই লেখকদের ঠিকানা ও ফোন নম্বর বের করতে তৎপর। অনেকেই আতঙ্কে এসব তথ্য গোপন রাখছেন। তবে হামলাকারীরা বারবার হুমকি দিচ্ছে, “এবার ঠিকানা পেয়েছি, মানুষ চিনে রেখো। খুঁজে বের করবোই।”
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব ঘটনা কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত নয় বরং দেশের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারেরও লঙ্ঘন। লেখক, সাংবাদিক, এমনকি সাধারণ নাগরিকরা ভীত হয়ে পড়ছে যে, সত্য বলার জন্য তাদের জীবন দিয়ে মাশুল দিতে হতে পারে। এক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশ্লেষক বলেন, “বাংলাদেশে এই ধরণের চরমপন্থার বিস্তার কেবল দেশের ভেতরে নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি অশনি সংকেত।”