অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দান-সদকা করা এবং বিপদগ্রস্তদের সহায়তা করা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল। তবে ইসলাম শুধু দানের পরিমাণকে গুরুত্ব দেয় না; বরং দানের পেছনের নিয়তকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে যদি মানুষের প্রশংসা, জনপ্রিয়তা বা আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে দান করা হয়, তাহলে সেই আমলের সওয়াব নষ্ট হওয়ার বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে।
রিয়া কী এবং কেন এত ভয়াবহ?
ইসলামী পরিভাষায় ‘রিয়া’ বলতে বোঝায় এমন ইবাদত বা নেক কাজ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়। হাদিসে রিয়াকে ‘শিরকে আসগর’ (ছোট শিরক) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এতে ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে সরে গিয়ে মানুষের স্বীকৃতি ও প্রশংসার দিকে চলে যায়।
কোরআনের স্পষ্ট সতর্কবার্তা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“সুন্দর কথা ও ক্ষমা সেই দানের চেয়ে উত্তম, যার পরে (গ্রহীতাকে) কষ্ট দেওয়া হয়।”
(সুরা আল-বাকারা: ২৬৩)
পরবর্তী আয়াতে আরও বলা হয়েছে,
“হে মুমিনগণ! খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দান নষ্ট করে দিও না, সেই ব্যক্তির মতো, যে লোক দেখানোর জন্য তার সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না।”
(সুরা আল-বাকারা: ২৬৪)
এই আয়াত দুটি স্পষ্ট করে যে, শুধু দান করাই যথেষ্ট নয়; দানের নিয়ত এবং পরবর্তী আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কেয়ামতের দিন দানশীল ব্যক্তিও কেন শাস্তি পেতে পারেন?
সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদের বিচার হবে, তাদের একজন হবেন এমন ব্যক্তি যিনি দুনিয়ায় অনেক দান করেছিলেন।
আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, “কোন উদ্দেশ্যে দান করেছিলে?”
তিনি বলবেন, “আপনার সন্তুষ্টির জন্য।”
তখন আল্লাহ বলবেন,
“তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি দান করেছিলে যাতে মানুষ তোমাকে দানশীল বলে। তারা তা বলেছেও।”
এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হবে।
(সহিহ মুসলিম: ১৯০৫)
এই হাদিস প্রমাণ করে, বিশুদ্ধ নিয়ত ছাড়া বড় বড় নেক আমলও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
গোপনে দান কেন বেশি মর্যাদাপূর্ণ?
ইসলামে গোপন দানকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া লাভকারী সাত শ্রেণির মানুষের একজন হবেন—
“যে ব্যক্তি এমনভাবে দান করে যে, তার ডান হাত যা দান করেছে, বাম হাতও তা জানতে পারে না।”
(সহিহ বুখারি: ৬৬০, সহিহ মুসলিম: ১০৩১)
এ থেকেই বোঝা যায়, দানের সৌন্দর্য আত্মপ্রচারে নয়; বরং আন্তরিকতা ও ইখলাসে।
সামাজিক মাধ্যমে দানের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা কি বৈধ?
অনেকেই মনে করেন, প্রকাশ্যে দান করলেই তা রিয়া। বিষয়টি এতটা সরল নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান করো, তবে তা ভালো। আর যদি গোপনে অভাবগ্রস্তদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।”
(সুরা আল-বাকারা: ২৭১)
অর্থাৎ প্রকাশ্যে দান করা সবসময় নিষিদ্ধ নয়। তবে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথমত, নিয়ত। যদি উদ্দেশ্য হয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অন্যদের উৎসাহিত করা বা জবাবদিহি বজায় রাখা, তাহলে সীমিত পরিসরে দান প্রকাশ করা বৈধ হতে পারে। কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয় জনপ্রিয়তা অর্জন বা প্রশংসা কুড়ানো, তাহলে তা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে।
দ্বিতীয়ত, গ্রহীতার সম্মান। বর্তমানে ত্রাণ বিতরণ বা সাহায্যের ছবি-ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। এতে যদি সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিব্রত হন বা তার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে, তাহলে তা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে গ্রহীতার সম্মতি থাকলে, পরিচয় গোপন রাখা হলে বা প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতার স্বার্থে সীমিত তথ্য প্রকাশ করলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।
ভালো কাজের জন্য প্রশংসা পেলে কি সেটিও রিয়া?
না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
যদি কেউ একান্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো নেক কাজ করেন এবং পরে মানুষ তা জেনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশংসা করে, তাহলে সেটি রিয়া নয়।
হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কোনো ব্যক্তি ভালো কাজ করার পর মানুষ তার প্রশংসা করলে এবং সে এতে আনন্দিত হলে সেটি কি রিয়া?
রাসুলুল্লাহ (স.) জবাব দেন,
“এটি মুমিনের জন্য দুনিয়াতেই প্রাপ্ত সুসংবাদের অংশ।”
(সহিহ মুসলিম: ২৬৪২)
অর্থাৎ প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কাজ করা এবং কাজের পরে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশংসা পাওয়া—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
রিয়া থেকে বাঁচতে করণীয়
রিয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে ইসলাম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে—
- প্রতিটি আমলের আগে ও পরে নিজের নিয়ত পর্যালোচনা করা।
- সুযোগ থাকলে গোপনে দান করা।
- দানের পর খোঁটা দেওয়া বা অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে না দেওয়া।
- নিয়মিত আল্লাহর কাছে ইখলাসের জন্য দোয়া করা।
রাসুলুল্লাহ (স.) রিয়া থেকে বাঁচার জন্য এই দোয়াটি শিক্ষা দিয়েছেন—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা আন উশরিকা বিকা ওয়া আনা আ’লাম, ওয়া আস্তাগফিরুকা লিমা লা আ’লাম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি জেনে-শুনে আপনার সঙ্গে কাউকে শরিক করা থেকে আপনার আশ্রয় চাই। আর অজান্তে যা করেছি, তার জন্য আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
(আদাবুল মুফরাদ: ৭২১; সহিহ আল-জামে: ৩৭৩১)
ইখলাসই একজন মুমিনের প্রকৃত সম্পদ
দান-সদকা দুনিয়া ও আখিরাতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল। তাই সাময়িক প্রশংসা বা জনপ্রিয়তার মোহে এই ইবাদতের মর্যাদা নষ্ট করা একজন মুমিনের জন্য কখনোই কাম্য নয়। মানুষের করতালি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা একটি কবুল হওয়া আমলই আখিরাতের সবচেয়ে বড় সফলতা।