হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে রেখে দিনাজপুরের বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। দিন-রাত পরিশ্রম করে কাদামাটি, খড়, বাঁশ, সুতলি ও রঙতুলির নিপুণ ছোঁয়ায় দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য প্রতিমাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিচ্ছেন তারা। আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। পূজার সূচি অনুযায়ী মহাপঞ্চমী ১৫ অক্টোবর, মহাষষ্ঠী ১৬ অক্টোবর, মহাসপ্তমী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর, মহাষ্টমী ১৯ অক্টোবর, মহানবমী ২০ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে। শারদীয় দুর্গোৎসব সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে ২৪ সেপ্টেম্বর দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠিত প্রস্তুতিমূলক সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম। দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবার দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ৩১৭টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূজাকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় উৎসাহ-উদ্দীপনাও বেড়েছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। পাশাপাশি ডেকোরেশন, আলোকসজ্জা ও মণ্ডপসজ্জার কাজও এগিয়ে চলছে। দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন মন্দির ও প্রতিমা তৈরির কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক ও অসুরের প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা। কোথাও চলছে খড় ও বাঁশের কাঠামো তৈরির কাজ, কোথাও কাদামাটির প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। আবার কোনো কোনো মণ্ডপে প্রতিমার শেষ ধাপের কাজ হিসেবে রং ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। কারিগরদের নিপুণ হাতে ধীরে ধীরে মাটির কাঠামোতে ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার রূপ। পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করছেন তারা। প্রতিমা কারিগর জগন্নাথ জানান, তিনি এবার ১২ টি মন্ডপের কাজ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি ১০টির কাজ সম্পন্ন করেছেন। আর দুটিতে কাজ চলছে। তিনি আরো জানান, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে কমিটি পুজার বাজেট বাড়াচ্ছে না। আমাদেরও সব কিছু কিনে কাজ করে খুব একটা পোষায় না। তিনি জানান, একটি পূর্ণাঙ্গ দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে প্রায় দুই মাস বা তারও বেশি সময় লাগে। মণ্ডপের আকার, প্রতিমার নকশা এবং আয়োজকদের চাহিদার ওপর সময় কম-বেশি হয়। পূজা ঘনিয়ে আসায় এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে দিন-রাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
আরেক প্রতিমা কারিগর নরেশ পাল বলেন, ‘দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরি আমাদের কাছে শুধু পেশা নয়, এটি শিল্প ও ঐতিহ্যের অংশ। একটি কাঠামোকে ধীরে ধীরে মাটি দিয়ে প্রতিমার রূপ দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সেটিকে সুন্দর করে তোলা অনেক পরিশ্রমের কাজ। তবে প্রতিমা তৈরির পর মানুষের আনন্দ দেখে আমাদের পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।’
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্ট দিনাজপুর জেলা শাখার আহবায়ক উত্তম কুমার রায় জানান, এবার জেলার ১৩টি উপজেলায় ১ হাজার ৩০৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। জেলার মণ্ডপগুলোতে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপসজ্জা ও অন্যান্য কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে আয়োজকরা দিনরাত কাজ করছেন। উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনের পাশাপাশি প্রতিটি মন্দিরে কমিটির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবীরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন।
বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ দিনাজপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক উত্তম রায় জানান, এখন পর্যন্ত দিনাজপুর জেলায় ১ হাজার ৩০৬টি পুজা মন্ডপে শারদীয় দুর্গা পুজা অনুষ্ঠিত হবে উপজেলা কমিটিগুলো থেকে জানা গেছে। তবে তা বাড়তে পারে। ১ হাজার ৩০৬টির মধ্যে দিনাজপুর সদরে ১৭০ টি, বীরগঞ্জে ১৬৬ টি, কাহারোলে ১০০টি, বিরলে ৯৮ টি, বোচাগঞ্জে ৮৩টি, চিরিরবন্দরে ১৫৮ টি, খানাসামায় ১৪৪ টি, ফুলবাড়ীতে ৬২ টি, পার্বতীপুরে ১৫১ টি, বিরামপুরে ৪৩ টি, নবাবগঞ্জে ৭৩ টি, হাকিমপুরে ২২ টি এবং ঘোড়াঘাট উপজেলায় ৩৬ টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
নিরাপত্তার বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পূজার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পূজা উদযাপন কমিটি, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।