বাংলাদেশের নতুন সরকার বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ার নীতিতে চলার কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান| শুক্রবার (৫ জুন) ঢাকা সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে যৌথ ব্রিফিংয়ে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ‘বাংলাদেশ প্রথম’ এর ব্যাখ্যায় এ কথা বলেন তিনি| পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ প্রথম’, এ দর্শনে আমাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি চালিত| এর মানে এই নয় বাংলাদেশ একা| এর মানে হচ্ছে, বাংলাদেশের ¯^াধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ¯^ার্থ এবং আমাদের জনগণের কল্যাণের বিষয়ে আমাদের রয়েছে দৃঢ় অঙ্গীকার| একই সঙ্গে, এটা আমাদের এমন বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটাচ্ছে, আমাদের সীমান্তের বাইরে আমাদের রয়েছে বন্ধু ও অংশীদার, প্রভু নয়| এদিন সকালে ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিদানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ˆবঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল| এরপর তাদের একান্ত ˆবঠকও হয়| এরপর ব্রিফিংয়ে এসে ˆবঠকে আলোচনার বিভিন্ন দিক এবং ˆবশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের মনোভাবের কথা তুলে ধরেন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী| তবে, তারা কোনো প্রশ্ন নেননি| বাংলাদেশে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কথা তুলে ধরে খলিলুর রহমান বলেন, সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে চলা কূটনীতিতে বাংলাদেশ জোরালোভাবে বিশ্বাস করে| বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ার বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ| সহযোগিতার বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে অভিন্ন ¯^ার্থ, আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি সম্মান এবং অংশীদারত্ব ও বন্ধুত্বের চেতনা| আমরা আরও বিশ্বাস করি, আমাদের সময়ের ˆবশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বহুপাক্ষীয় সহযোগিতা অপরিহার্য|
শান্তি, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অভিন্ন উন্নতি এবং পারস্পরিকভাবে মঙ্গলজনক সহযোগিতার প্রসারে তুরস্কের মতো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ কাজ করে যাবে, বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী|
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে’ এই সফর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে নতুন প্রচেষ্টার জন্য তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দেন তিনি| খলিলুর রহমান বলেন, আমরা এখানে হাত প্রসারিত করে প্রস্তুত আছি এবং আমি জানি আপনিও প্রস্তুত| সুতরাং ভবিষ্যতে আমাদের সম্পর্ককে ভিন্ন উচ্চতায় নেওয়ার ক্ষেত্রে ত্বরিৎ পদক্ষেপ গ্রহণ না করার কোনো কারণ নেই| রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ এবং ক্রমবর্ধমান দেশীয় বাজারের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে তুরস্ককে আহ্বান জানানোর কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী| তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনার বিষয়টি তিনি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন এবং বাংলাদেশের বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তুরস্কের বিনিয়োগকারীদেরকে| বাংলাদেশে একটি নিজ¯^ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) স্থাপনের প্রস্তাব আমরা তুরস্ককে দিয়েছি| বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লাভের সম্ভাবনা দেখিয়ে খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ এবং ক্রমবর্ধমান দেশীয় বাজারের সুযোগ নিয়ে তুর্কি সহযোগিতা ও সমš^য় সংস্থার (টিকা) মাধ্যমে বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং শিল্প অংশীদারত্ব বাড়ানার অনুরোধ আমরা করেছি| বস্ত্র ও পোশাক, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, জাহাজ ˆতরি, ওষুধ, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), স্মার্ট প্রযুক্তি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে তুরস্কের বিনিয়োগের সুযোগ থাকার বিষয়ও ˆবঠকে তুলে ধরার কথা বলেন তিনি| পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় তুরস্কের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আমরা আলোকপাত করেছি| অন্তর্বর্তীকালে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) চুক্তির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে| দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে ‘কাঙ্খিত মাত্রায়’ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার কথাও বলেন তিনি| খলিলুর রহমান বলেন, ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট করার বিষয়ে তুরস্ককে প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি| জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের নির্বাচনে জেতার পেছনে ‘অমূল্য সমর্থনের’ জন্য তুরস্ক সরকারের প্রতি ˆবঠকে কৃতজ্ঞতা জানানোর কথা বলেন খলিলুর রহমান| তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি নির্বাচনের পর মাত্র গতকালই (বৃহস্পতিবার) ফিরেছি এবং আপনাকে বাংলাদেশে ¯^াগত জানানোর সুযোগ পেয়েছি| ব্যক্তিগতভাবে আপনার কাছ থেকে যে সমর্থন, উৎসাহ এবং সহযোগিতা আমি পেয়েছি, সেটি আমি কখনও ভুলব না| তুরস্কের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ দেশ সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাশিতম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল| ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার পর ভোটের প্রচারের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে তুরস্কে গিয়েছিলেন খলিলুর রহমান| এরপর তুরস্কের আনতালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরামকেও ভোটের প্রচারে কাজে লাগান তিনি| মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি তুরস্কের মানবিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে এটা নিয়ে কাজ করায় তুরস্ককে ধন্যবাদ দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী| তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট| মানবিক জায়গা থেকে বিশাল সংখ্যক এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ| আমি সহমর্মিতা ও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি সেটা ঠিক, কিন্তু এই পরিস্থিতি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে পারে না| রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তাদের নিজভূমি মিয়ানমারে দ্রুততার সঙ্গে নিরাপদ, ¯ে^চ্ছা, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন আমাদের আগ্রাধিকার|