১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির মধ্যে চট্টগ্রাম ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বন্দরনগরীটিতে অবস্থান করছিল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার (ইবিআরসি)। সেখানে বিপুলসংখ্যক বাঙালি সৈনিক ও রিক্রুট থাকায় চট্টগ্রাম নিয়ন্ত্রণে নেওয়াকে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছিল। সেই সময়ের বিদ্রোহের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা এবং ২৫ মার্চের রাতের ঘটনাপ্রবাহই উঠে এসেছে সেনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ লুৎফুল হকের বই ‘১৯৭১: চট্টগ্রাম বিদ্রোহ ও ব্রিগেডিয়ার মজুমদার’-এ। বইটির বিষয়বস্তু মূলত চট্টগ্রামে বাঙালি সেনাদের বিদ্রোহ এবং এতে ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার ও তাঁর সহযোদ্ধাদের ভূমিকা ঘিরে।
মাত্র ৯৬ পৃষ্ঠার বই হলেও এতে মার্চ ১৯৭১-এর উত্তাল দিনগুলোর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। লেখক নিজে সামরিক কর্মকর্তা হওয়ায় যুদ্ধের প্রস্তুতি ও রণপরিস্থিতির বর্ণনায় সামরিক প্রেক্ষাপট বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
গ্রন্থে বিশেষভাবে এসেছে এমভি সোয়াত জাহাজে আনা অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাসের ঘটনা। অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান নেওয়া এ জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানো নিয়ে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা ও বন্দরকর্মীদের মধ্যে আপত্তি তৈরি হয়। ঐতিহাসিক দলিলেও ২৪ মার্চ সোয়াতের অস্ত্র খালাস নিয়ে চট্টগ্রামে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের উল্লেখ পাওয়া যায়।
লুৎফুল হকের বর্ণনায়, এ পরিস্থিতিতে ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদারের ওপর পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের চাপ বাড়তে থাকে। সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাসে সহযোগিতা না করার কারণে তাঁকে ভর্ৎসনাও করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই জাহাজের অস্ত্র খালাসকে ঘিরে চট্টগ্রামের জনতা ও বাঙালি সেনাদের মধ্যে প্রতিরোধের পরিবেশ আরও তীব্র হয়।
বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চট্টগ্রামে বাঙালি সামরিক সদস্যদের বিদ্রোহের প্রস্তুতি। গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, অসহযোগ আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার রাজনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছিলেন। মেজর জিয়া, ক্যাপ্টেন রফিক ও লে. কর্নেল এম আর চৌধুরীসহ কয়েকজন কর্মকর্তা সম্ভাব্য পাকিস্তানি আক্রমণের প্রেক্ষাপটে পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের দলিলভিত্তিক বিভিন্ন বর্ণনাতেও চট্টগ্রামে এসব কর্মকর্তার মধ্যে বিদ্রোহের প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের তথ্য পাওয়া যায়।
১৭ মার্চের দিকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর, নৌঘাঁটি, বন্দর, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও রেডিও স্টেশন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার একটি পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছিল বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর আসে ২১ মার্চের ঘটনা। সেদিন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল হামিদের চট্টগ্রাম সফরকে গ্রন্থে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেনানিবাসে আয়োজিত এক মধ্যাহ্নভোজে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের কথোপকথন ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে মেজর জিয়া সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত পান বলে বইটিতে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই তথ্য পরে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিনিময় করা হয়।
এর পর ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঢাকার সেনা সদরে তলব করা হয়। বইটির বর্ণনা অনুযায়ী, ২৫ মার্চ সকালে তাঁকে জেনারেল টিক্কা খানের সামনে হাজির করা হয় এবং সোয়াতের অস্ত্র খালাসের বিষয়ে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ ও ভর্ৎসনা করা হয়। পরে জয়দেবপুর থেকে ফিরে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি দেখে তিনি বিদ্রোহের সময় ঘনিয়ে এসেছে বলে উপলব্ধি করেন।
২৫ মার্চের কালরাতে পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয়। বই অনুযায়ী, মধ্যরাতের পর ইপিআরে ক্যাপ্টেন রফিক এবং অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে মেজর জিয়া বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। একই সময়ে ইবিআরসিতেও সংঘর্ষ শুরু হয়। সেখানে পাকিস্তানি ২০তম বালুচ রেজিমেন্ট আগেই ভারী অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় এবং লে. কর্নেল এম আর চৌধুরি নিহত হন বলে গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বিদ্রোহের পাশাপাশি বইটিতে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের গ্রেপ্তার ও পরবর্তী নির্যাতনের ঘটনাও গুরুত্ব পেয়েছে। ঢাকায় আটক হওয়ার পর তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বিদ্রোহের পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখে পড়তে হয় বলে বইটিতে বর্ণনা করা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের জীবনের এই অধ্যায়ও মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বইটিতে স্থান পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, ‘১৯৭১: চট্টগ্রাম বিদ্রোহ ও ব্রিগেডিয়ার মজুমদার’ চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে বাঙালি সামরিক সদস্যদের অবস্থান, বিদ্রোহের প্রস্তুতি এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের একটি সংক্ষিপ্ত দলিলভিত্তিক বিবরণ তুলে ধরেছে। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইটির লেখক মুহাম্মদ লুৎফুল হক। বইটির প্রথম প্রকাশ ২০২৫ সালে এবং এতে ৯৬ পৃষ্ঠা রয়েছে।
বইয়ের তথ্য:
নাম: ১৯৭১: চট্টগ্রাম বিদ্রোহ ও ব্রিগেডিয়ার মজুমদার
লেখক: মুহাম্মদ লুৎফুল হক
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: এপ্রিল ২০২৫
পৃষ্ঠা: ৯৬
মূল্য: ২৮৫ টাকা
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল