ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার পেছনে বংশগত কারণ, পরিবেশ, বয়সসহ নানা বিষয় ভূমিকা রাখে। এর পাশাপাশি জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসও বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। সব ধরনের ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহারের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
চিকিৎসাবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি অভ্যাস হলো—
ক্যানসারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি হলো তামাকের ব্যবহার। সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ধোঁয়ায় বহু ক্যানসারসৃষ্টিকারী রাসায়নিক থাকে। এসব রাসায়নিক শরীরের কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শুধু নিজে ধূমপান করাই নয়, অন্যের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসাও ক্ষতিকর। তাই ধূমপান না করাই সবচেয়ে নিরাপদ। যারা ধূমপান করেন, তাদের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কমানোর পাশাপাশি সম্পূর্ণ ছাড়ার চেষ্টা করা উচিত।
শরীরের সুস্থতা ও স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ বজায় রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অনিয়মিত সময়ে ঘুমানো বা দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করা ভালো। ঘুমের সময় ঘর অন্ধকার রাখা এবং শোয়ার আগে মোবাইল, ল্যাপটপসহ উজ্জ্বল স্ক্রিনের ব্যবহার কমানোও উপকারী।
তবে নির্দিষ্ট রাত ১১টা থেকে ৩টার মধ্যেই শরীরের ডিএনএ মেরামত হয় বা সামান্য নীল আলোতেই মেলাটোনিন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়—এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তাই ঘুমের বিষয়ে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।
খাবারের সময় ও দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার বিষয়টি নিয়ে ‘টাইম-রেস্ট্রিক্টেড ইটিং’ বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার গ্রহণ নিয়ে গবেষণা চলছে। কিছু গবেষণায় এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারের কথা উঠে এসেছে। তবে দীর্ঘ সময় পেট খালি রাখলেই শরীর ক্যানসারসৃষ্টিকারী সব উপাদান ‘পরিষ্কার’ করে ফেলে—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
স্বাস্থ্যকর থাকার জন্য অতিরিক্ত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত চিনি কমিয়ে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য ও আঁশযুক্ত খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিভেদে খাবারের সময় ও উপবাসের প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।
খাবার সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো ভালো অভ্যাস। বিশেষ করে গরম খাবার প্লাস্টিকের অনুপযুক্ত পাত্রে রাখা বা গরম করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কিছু প্লাস্টিক ও শিল্প-রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে হরমোনের কার্যক্রমে পরিবর্তনসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে এলেই সরাসরি স্তন, জরায়ু বা থাইরয়েড ক্যানসার হবে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
গরম খাবারের জন্য উপযুক্ত কাচ, স্টেইনলেস স্টিল বা অন্যান্য নিরাপদ পাত্র ব্যবহার এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো যেতে পারে।
অ্যালকোহল গ্রহণ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শরীরে অ্যালকোহল ভাঙার সময় অ্যাসিটালডিহাইড তৈরি হয়, যা কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ছাড়া অ্যালকোহল শরীরের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে, যার সঙ্গে কিছু ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অ্যালকোহল গ্রহণের সঙ্গে মুখ ও গলা, খাদ্যনালি, লিভার, স্তন ও কোলনসহ বিভিন্ন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। তাই ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে অ্যালকোহল না পান করাই সবচেয়ে নিরাপদ; যারা পান করেন, তাদের গ্রহণের পরিমাণ কমানো ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো একটি অভ্যাস পরিবর্তন করলেই ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। ধূমপান পরিহার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং—সব মিলিয়ে ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।