আজহারুল আজাদ জুয়েল, দিনাজপুর : অভিনয় শিল্পীদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, দর্শকের প্রাণবন্ত হাউজফুল উপস্থিতি ও দীর্ঘ করতালির মধ্য দিয়ে দিনাজপুরে সফলভাবে মঞ্চস্থ হলো বাংলা নাট্য সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্তের কালজয়ী প্রহসনমূলক নাটক বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, দিনাজপুর জেলা সংসদের প্রযোজনায় ৩১ জুলাই শুক্রবার সন্ধ্যায় দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে দিনাজপুরের প্রখ্যাত নাট্যকার নয়ন বার্টেল এর প্রযোজনা, সম্পাদনা ও নির্দেশনায় নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ নাটকটি উনিশ শতকের বাংলার সমাজবাস্তবতাকে ব্যঙ্গাত্মক রূপে তুলে ধরা একটি অনন্য নাট্যকর্ম। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ভক্তপ্রসাদ একজন ধর্মভীরু ও সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি যা তার বাইরে রূপ। কিন্তু অন্তরালে তিনি একজন মুখোশধারী ভণ্ড, লোভী ও নারী লালসাপরায়ণ। নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্ম, নীতি ও সামাজিক মর্যাদাকে ব্যবহার করেন আর অন্তরে দুশ্চরিত্র ও লোককে ধারণ করেন। নাটকের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে সমাজের ভণ্ডামি, ধর্মীয় গোঁড়ামি, ক্ষমতার অপব্যবহার, শ্রেণিবৈষম্য, কুসংস্কার এবং সুবিধাবাদী মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। একের পর এক হাস্যরসাত্মক ঘটনা ও তীক্ষ্ণ সংলাপের মাধ্যমে ভক্তপ্রসাদের প্রকৃত চরিত্র উন্মোচিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার ভণ্ডামির মুখোশ খুলে যায়। প্রহসনটি কেবল হাসির খোরাক নয়, বরং সমাজের অসঙ্গতি ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ব্যঙ্গ। প্রায় দেড়শ বছর আগে রচিত হলেও এর বক্তব্য ও সামাজিক তাৎপর্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, যা নাটকটিকে বাংলা নাট্য সাহিত্যের অন্যতম কালজয়ী সৃষ্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।শুরু থেকেই দর্শকে পরিপূর্ণ মিলনায়তনে নাটকটি উপভোগ করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। দর্শক সারিতে উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, স্থানীয় সরকার দিনাজপুরের উপপরিচালক শেখ হাফিজুর রহমান, জেলার স্বনামধন্য চিকিৎসক, সাংবাদিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিপুল সংখ্যক নাট্যপ্রেমী। দর্শকের উপচে পড়া ভীড় এতটাই ছিল যে, অনেকে টিকিট নিয়েও সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে এবং মেঝেতে বসে নাটকটি দেখেছেন।নাটকে ভক্তপ্রসাদ চরিত্রে হারুন উর রশিদ, গদাধর চরিত্রে সুস্ময় ঘোষ, হানিফ গাজী চরিত্রে আলমগীর কবীর আসাদ, ফতে চরিত্রে মোহনা সারোয়ার, পুটি চরিত্রে সীমা পন্ডিত, বাচস্পতি চরিত্রে শেখ ছগীর আহমেদ কমল, ভগি চরিত্রে নিম্মি ইহাম, পঞ্চি চরিত্রে পূজা রায়, আনন্দবাবু চরিত্রে এস এম সারোয়ার, রামা চরিত্রে তারাপদ রায়, ননী চরিত্রে প্রতুল দাস, গায়েন চরিত্রে সুজন দে এবং বিশেষ চরিত্রে তাথৈ রায় অভিনয় করেন। কোরাস দলে ছিলেন অন্বেষা কুন্ডু, রুমি গুপ্তা ও মাধবী কুন্ডু।মঞ্চায়নে বিশেষভাবে দর্শকপ্রিয় হয়ে ওঠে ভক্তপ্রসাদ, গদাধর ও রামা চরিত্র। সংলাপ, অভিনয়শৈলী, মঞ্চ-উপস্থাপনা ও ব্যঙ্গরস দর্শকদের বারবার হাসির রোল ও করতালিতে মুখরিত করে তোলে পুরো মিলনায়তন জুড়ে। ও মঞ্চসজ্জা, আলোক পরিকল্পনা, আবহসংগীত, রূপসজ্জা ও অন্যান্য কারিগরি উপস্থাপনাও নাটকটির শিল্পমানকে সমৃদ্ধ করে।নাটক শেষে নির্দেশক নয়ন বাটেল বলেন, “গত আড়াই মাস ধরে শিল্পীদের নিয়ে নিরলস মহড়া করেছি। কখনো বকাঝকা করে, কখনো উৎসাহ দিয়ে তাদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার চেষ্টা করেছি। এই দলে যেমন অভিজ্ঞ অভিনয়শিল্পী রয়েছেন, তেমনি আনকোরা নতুনরাও আছেন। কতটা সফল হয়েছি, তার মূল্যায়ন করবেন দর্শকরাই। তবে আমি বিশ্বাস করি, সবাই আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে অনেক ভালো অভিনয় করেছে।সমাপনীতে দর্শক, শুভানুধ্যায়ী ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, দিনাজপুর জেলা সংসদের সভাপতি অধ্যাপক জলিল আহমেদ। তিনি বলেন, “দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এই আয়োজন সফল করতে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। ভবিষ্যতেও উদীচী দিনাজপুর মানসম্মত নাট্যচর্চা ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে।