স্বাস্থ্য খাতে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও সরকারি অর্থ অপচয়ের উদাহরণ টেনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, যেসব চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনে ফেলা রাখা হয়েছে সেগুলো ভাঙ্গারি দোকানে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই। বুধবার (২৯ জুলাই) ঢাকায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন নিয়ে গবেষণার ফল প্রকাশের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে ১১ কোটি টাকার রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকা দিয়ে দুটি কেনা হয়েছিল। অথচ যেখানে বসানো হয়েছে, সেখানে কোনো প্রস্তুতিই (রেডি সেটআপ) ছিল না। কেন কেনা হয়েছিল? কারণ প্রতি মেশিনে ৪ থেকে ৬ কোটি টাকা লাভ ছিল। যার একটি পড়ে আছে ফরিদপুরে, অন্যটি খুলনায়। একইভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে কারিগরি লোকবল ছাড়াই এক্স-রে ও অন্যান্য টেকনোলজির সরঞ্জাম কিনে ফেলে রাখার প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, পরবর্তীতে এগুলো ভাঙ্গারির কাছে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই। রোগ পরীক্ষার বাণিজ্য বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা তুলে ধরে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব রেখে বাইরে পাশের ক্লিনিক খোলাবেন, সরকারি দায়িত্ব রেখে সেখানে সার্জারি করবেন আর কমিশন খাবেন, রোগী আসলে বলবেন পাশের ক্লিনিকে গিয়ে টেস্ট করতে-এসব বন্ধ করতে হবে। এগুলো নজরে রাখার কথাও বলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমল থেকে একটি বিদেশি কোম্পানি চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ডায়ালাইসিসের বাজার দখল করে রেখেছিল। নভেম্বরে তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন করা হবে না। সরকার এখন নিজস্ব উৎস থেকে ডায়ালাইসিস মেশিন কিনবে। এতে আগামী ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে এবং অত্যন্ত কম খরচে সাধারণ মানুষ ডায়ালাইসিস সেবা পাবে বলে মনে করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয় দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক এই গবেষণার ফল প্রকাশের অনুষ্ঠান হয়। যৌথভাবে গবেষণাটি করেছে ‘পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেন্ট রিসার্চ সেন্টার-পিপিআরসি’ ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট। অনুষ্ঠানে গবেষণার ফল উপস্থাপনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক। গবেষণাটি দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালিত হয়। গবেষণায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়। এ ছাড়া ৯৫ জন কর্মকর্তার জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত চর্চা বিষয়ে একটি জরিপ পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপক, জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, সরবরাহকারী, শিক্ষাবিদ ও রোগীদের ৩২টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক বাজেট ব্যবহারের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল সবচেয়ে কম, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অব্যয়িত অর্থ থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও মাত্র ১১ শতাংশ আর্থিক অব্যবস্থাপনাকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ফল থেকে প্রতীয়মান হয় যে উত্তরদাতাদের দৃষ্টিতে অব্যয়িত অর্থের প্রধান কারণ আর্থিক অনিয়মের চেয়ে বাজেট ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক জটিলতার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। প্রতিবেদনে বলা হয, সাধারণ সরঞ্জাম খাতে বরাদ্দের মাত্র ২৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। ভ্রমণ ও স্থানান্তরসংক্রান্ত খাতে ব্যয়ের হার ছিল ৬৮ শতাংশ এবং পেশাগত সেবা ও সম্মানী খাতে ৫৯ শতাংশ।
অনিয়মের বিষয়ে মন্ত্রী দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টানেন। তিনি বলেন, পছন্দের লোককে কাজ দিতে টেন্ডারে এমন অবাস্তব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। এ ব্যাখ্যায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যেমন পাঁচ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়া কয়জন ব্যবসায়ী এই শর্ত পূরণ করতে পারবে? এটি করা হয় মূলত প্রতিযোগিতা সীমিত করে পছন্দের পাত্রকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য। দেশের নারী ও সাধারণ মানুষের স্তন ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার এবং ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও মানুষের অসচেতনতার বিষয়টি তুলে ধরে সরকারের ‘যুগান্তকারী’ উদ্যোগের কথা বলেছেন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, দেশের ১০টি উপজেলা ও ৯০টি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল, স্মার্টফোন এবং এআই সমৃদ্ধ ‘কিট বক্স’ প্রদান করা হবে। এটি আগামী তিন মাসের মধ্যে শুরু হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে দৈহিক মাপ (উচ্চতা, ওজন), ডায়াবেটিস, রক্তচাপ এবং যন্ত্রের সাহায্যে রক্তের লিপিড প্রোফাইল, আরবিসি ও সিবিসি টেস্ট করবেন। পুরুষদের কাছে পুরুষকর্মী এবং নারীদের কাছে নারী কর্মী যাবেন। হাসপাতালে স্বাভাব্কি প্রসবের হার বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, হাসপাতালে সন্তানসম্ভবা মা এলে পরিবারকে ভয় দেখিয়ে (যেমন-সিজার না করলে মা বা বাচ্চা মারা যেতে পারে) সিজারিয়ান অপারেশনে বাধ্য করার যে প্রতারণামূলক ব্যবসা চলছে, তা বন্ধে কঠোর তদারকি শুরু হয়েছে। সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে সারাদেশে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে আকস্মিক পরিদর্শন ও তদারকি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী লেবার রুম, লেবার চেয়ার কিংবা নবজাতককে তাপ দেওয়ার ন্যূনতম আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই অপারেশন চালিয়ে যাওয়া অনেক ক্লিনিক ইতিমধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা।