মামলাজট নিরসনে কার্যকর হচ্ছে মধ্যস্থতা পদ্ধতি: আইনমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের মামলাজট কমাতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এখন থেকে নির্দিষ্ট সাত ধরনের বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতে মামলা দায়েরের আগে বাধ্যতামূলকভাবে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার (প্রি-কেস মেডিয়েশন) মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। প্রাথমিকভাবে দেশের আরও ১০ জেলায় এ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মামলাপূর্বক বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে। এতে বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত, কম খরচে এবং সহজ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পাচ্ছেন, পাশাপাশি আদালতে নতুন মামলা দায়েরও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন, যা বিচারব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়ানো গেলে বিচারপ্রার্থীর সময়, অর্থ ও হয়রানি কমবে, একই সঙ্গে আদালতের মামলার চাপও হ্রাস পাবে।

তিনি জানান, ২০টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মে সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বিভিন্ন আইনে মামলা দায়েরের সংখ্যা গড়ে ৬২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।

মামলা কমার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, পারিবারিক আদালত আইনে মামলা প্রায় ৫১ শতাংশ, বণ্টন সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা ৬৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ, স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রিম্পশন মামলা ৮৮ দশমিক ২৪ শতাংশ, নন-অ্যাগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনে ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ, যৌতুক নিরোধ আইনে ৬৭ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনে ১৮ দশমিক ৬০ শতাংশ কমেছে।

আইনমন্ত্রী বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেসব বিচারাধীন মামলা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি সম্ভব, সেগুলো জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার জন্য পাঠানো হলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে এবং মামলাজট কমবে।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আদালত, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামী এক বছরের মধ্যেই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের মাধ্যমে অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা ও দ্রুত ন্যায়বিচারের সুযোগ পাচ্ছে। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কক্সবাজারে বর্তমানে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্ট বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের আগামী তিন মাসের মধ্যে মামলাজট দৃশ্যমানভাবে কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে বলেও জানান।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, প্রি-কেস মেডিয়েশন বাস্তবায়নে জাইকা (JICA), জিআইজেড (GIZ) এবং ইউএনডিপি (UNDP)-এর সহযোগিতা প্রশংসনীয়। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, মধ্যস্থতা কার্যক্রমে কোনো ধরনের দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না এবং এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’

অনুষ্ঠানের শেষে আইনমন্ত্রী একযোগে বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল—এই ১০ জেলায় মামলাপূর্বক বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ২১খ অনুযায়ী চালু হওয়া এ ব্যবস্থায় এখন থেকে নির্ধারিত সাত ধরনের বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতে মামলা করার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।