বাংলাদেশকে বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন উদ্যোগ গ্রহণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, নতুন ও দূরদর্শী বিএনপি সরকার চায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে এসে বিনিয়োগ করুক, নতুন উদ্যোগ নিক এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ করুক। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক ‘এফআইসিসিআই এফডিআই সম্মেলন ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উদ্যোক্তা কিংবা বিদেশি বিনিয়োগকারী—যে কেউ বাংলাদেশে মূলধন বিনিয়োগ করলে সরকার সময়োপযোগী নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে তাদের পাশে থাকবে। এটি শুধু একটি আশ্বাস নয়, বরং সরকারের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার। তিনি বলেন, আজকের সম্মেলনে দেশি-বিদেশি করপোরেট প্রধান, বিনিয়োগকারী ও বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তর, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালীকরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। নিজের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, রাজনীতিতে আসার আগে তিনি নিজেও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, কোনো ব্যবসার সাফল্য শুধু উদ্যোক্তার দক্ষতা বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে না; বরং সরকারের প্রবৃদ্ধিবান্ধব নীতিমালাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের রয়েছে দ্রুত সম্প্রসারিত অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ ও পরিশ্রমী জনশক্তি, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনগণের সমর্থনপুষ্ট একটি নির্বাচিত সরকার। এসব শক্তিই বাংলাদেশকে টেকসই সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য একটি নিয়মভিত্তিক, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত এবং বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা। নির্বাচনি ইশতেহারে সেই অর্থনৈতিক রূপান্তরের সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শুধু বিনিয়োগকারী হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার দীর্ঘমেয়াদি ও বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। সরকারের গত পাঁচ মাসের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগেই অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার ভিত্তিতে বিনিয়োগবান্ধব সংস্কারের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। তারেক রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীদের প্রধান চাহিদার মধ্যে ছিল আইনি সুরক্ষা জোরদার, আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো, সহজ করব্যবস্থা, মুনাফা নির্বিঘ্নে নিজ দেশে পাঠানোর সুযোগ, শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং উন্নত অবকাঠামো। সরকার ইতোমধ্যে এসব ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। তিনি জানান, আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন, বিনিয়োগ সুরক্ষা, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, কর ও ভ্যাট প্রশাসন সহজীকরণ এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার শক্তিশালীকরণ, স্টার্টআপ খাতে উৎসাহ প্রদান, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানো, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন এবং বন্দর, লজিস্টিকস ও জ্বালানি নিরাপত্তা উন্নয়নে কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল সেবা, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা এবং লজিস্টিকস খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, তৈরি পোশাক শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল এবং বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ওপরই দেশের টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করবে।