সংসদ কার্যকর হলেই হবে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন: তথ্যমন্ত্রী

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন জাতীয় সংসদকে কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যাবে। রাজনৈতিক বিতর্ক, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে সংসদকেই। জুলাই সনদে স্বাক্ষরের সঙ্গে শহীদদের রক্তের বন্ধন রয়েছে। সরকার সেই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, বহু দেশ যেখানে মাত্র ৪০-৫০ বছরের মধ্যে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেখানে বাংলাদেশকে এখনও ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দিতে হচ্ছে। এ বাস্তবতা জাতির জন্য লজ্জার এবং আত্মসমালোচনার বিষয়। সোমবার (৩ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, রাজনৈতিক দলগুলোরই কোনো কোনো মহল অতীতে ফ্যাসিবাদকে সমর্থন ও দায়ভার গ্রহণ করেছিল। তবে দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জনগণ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে এবং সেই ভোটের মাধ্যমেই তাদের ম্যান্ডেট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণের সেই ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদ পরিচালনা করছে। এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো অর্জিত গণতন্ত্র, নির্বাচন ও সংসদীয় ব্যবস্থাকে দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠিত করা। মন্ত্রী বলেন, সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি দাবি করে জাতীয় সংসদই হবে রাজনৈতিক বিতর্ক, মতবিনিময় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান মঞ্চ। কিন্তু এখনও বিভিন্নভাবে রাজনীতিকে সংসদের বাইরে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। তিনি বলেন, শহীদদের স্মরণ শুধু আবেগ বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন সংসদকে কার্যকর করা যাবে, রাজনৈতিক বিতর্ককে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মধ্যে আনা যাবে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও জবাবদিহিমূলক করা সম্ভব হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বর্তমান সময়ে সংসদের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও রাজনৈতিক সংঘাতের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সেখানে দায়িত্বশীল আচরণের পরিবর্তে অস্থিরতা ও বিভাজনমূলক প্রবণতা উদ্বেগজনক। আদর্শের নামে যদি এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তবে তা আরও অশুভ সংকেত বহন করে। তিনি বলেন, জুলাই শহীদ, ভাষা আন্দোলন ও মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের আত্মত্যাগকে একই ধারায় মূল্যায়ন করতে হবে। এত রক্তের বিনিময়ে আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কতটা শক্তিশালী করতে পেরেছি, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, সংসদকে কার্যকর করা, বিচার বিভাগকে মর্যাদাপূর্ণ ও সক্রিয় করা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সুসংহত করা, বিশ্বমঞ্চে দেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি-এসবই বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এসব লক্ষ্য অর্জনে সব গণতান্ত্রিক শক্তির সহযোগিতা প্রয়োজন। জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যেমন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নেতারা জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করেছেন, তেমনি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বেও সুশাসন নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জনগণ যদি মনে করে কেউ বিভ্রান্তি, অস্থিরতা বা অন্য কোনো শক্তির ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে, তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই সরকার প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করবে। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, সুশাসন ও রাষ্ট্র গঠনের এ যাত্রায় সচেতন গণমাধ্যম অতীতের মতো ভবিষ্যতেও পাশে থাকবে-এটাই সরকারের প্রত্যাশা। আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, ডিইউজের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলম এবং বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম মহসীনসহ সিনিয়র সাংবাদিক ও সংগঠনের সদস্যরা।