সংবিধান পর্যালোচনায় নতুন সংশোধনী, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জুলাই সনদের আলোকেই : আইনমন্ত্রী

সংবিধানের সার্বিক গাঁথুনি ও সামঞ্জস্য রক্ষা করতে পুরো সংবিধানই পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তবে এই পর্যালোচনার সময় দেশের বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি বা মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখা হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে ২০২৫ সালের জুলাই সনদের মূল ভাবধারা ও চেতনার আলোকে। মঙ্গলবার (০৪ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের এসব কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, ২০২৫ সালের ঐতিহাসিক জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সর্বসম্মত আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করেই প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এই সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এটি কেবল সংসদীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মতামতকে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হবে। সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কমিটি খুব দ্রুতই জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবার, আহত ও সংগ্রামী জুলাই যোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধি, দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় সেশন আয়োজন করবে। একইসঙ্গে যারা এই জুলাই সনদ প্রণয়নে দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করেছেন, তাদের সঙ্গেও আইনগত দিকগুলো নিয়ে নিবিড় আলোচনা করা হবে, যাতে সনদটির প্রতিটি ধারাকে সাংবিধানিক আইনের সঠিক পরিভাষায় রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়। কমিটির অবকাঠামো ও গঠন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৭ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটিতে বিএনপিসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে জুনায়েদ সাকি, ভিপি নূর, আন্দালিব রহমান পার্থের মতো সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। তবে, বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি সদস্যপদের নাম উনারা সংসদীয় বাজেট অধিবেশনের সময় দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার কথা বললেও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের যুক্ত করার আন্তরিক প্রয়াস অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও এই কমিটির পক্ষ থেকে বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে যে, বিরোধী দল যখনই তাদের তালিকা প্রদান করবে, সঙ্গে সঙ্গেই তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, বিরোধী দল সরাসরি বৈঠকে না থাকলেও জুলাই সনদের মধ্যেই তাদের অধিকাংশ মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত রয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে একে ‘হারমোনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন’ বা অনুচ্ছেদগুলোর সুষম সমন্বয় বলা হয়।
ভারতের ‘কেশবসানন্দ ভারতী’ মামলার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, সাংবিধানিক আদালতের ‘বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি’ বা মূল কাঠামোর নীতি অক্ষুণ্ন রেখেই এই সংশোধন আনা হবে এবং কোনো ধরনের আবেগের বশে বা রাজনৈতিক আদর্শ চাপিয়ে দিয়ে মূল সংস্কার থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই। কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি তার বক্তব্যে এই মহৎ উদ্যোগের সময়োপযোগী গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সংবিধান কেবল কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ বা সরকারের জন্য নয়, এটি আগামী প্রজন্মের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দলিল হিসেবে কাজ করবে। সংসদের ২৬২ জন নবনির্বাচিত ও প্রথমবার আসা আইনপ্রণেতাদের বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক চর্চার দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫০ সালের পর থেকে ভারতে ১০৬ বার এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ বার সংবিধান পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সময়ের পরিবর্তন ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংবিধানের একটি কমা বা অক্ষরের পরিবর্তনও বিশাল সামাজিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের অংশ। তাই জাতীয় স্বার্থে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হতে বিরোধী দলসহ সবাইকে উদার চিত্তে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে সংবিধান পুনর্গঠনের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রক্রিয়ার সূচনা হলো। জুলাই সনদের অনুচ্ছেদগুলোকে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের সংবিধান রূপায়ণে এই কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সংসদে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব পেশ করবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।