স্টাফ কোয়ার্টার ঃ গতকাল ২রা এপ্রিল ছিলো কেরানীগঞ্জ শহীদদের স্মরণে পালিত হলো গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সনে ২ এপ্রিল প্রতি বছর এই দিনটি স্মরণ করে এলাকাবাসীসহ বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাগণ। প্রায় বিশ হাজার নিরীহ জনগণকে নিঃশংসভাবে হত্যা করে। স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য বরী মুক্তিযোদ্ধা তৌফিক এহসান এবং ঢাকা থেকে আগত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা মহানগরের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান শহিদ, কেন্দ্রীয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শাহজাহান আলী, মহানগরের বীর মুক্তিযোদ্ধা রিজভী খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম গোলাপ।
২ এপ্রিল। কেরানীগঞ্জ গণহত্যার ভয়াল দিন।
১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী তাদের সংগঠিত বাংলাদেশের বৃহত্তম গণহত্যা গুলোর একটি ঘটিয়েছিল সেদিন কেরানীগঞ্জে। শুধু হত্যার দিক থেকেই বৃহত্তম নয় নৃশংসতার দিক দিয়েও তা সভ্যতার ইতিহাসের এক কলংকজনক অধ্যায়। সেই বিষাক্ত ক্ষত এখনও দেহে ও মনে বয়ে বেড়াচ্ছেন বুড়িগঙ্গা পারের আসংখ্য নারী পুরুষ।
দিনটি ছিল শুক্রবার, ভোর থেকে শুরু হওয়া নয় ঘণ্টার রোমহর্ষক হত্যাকান্ড সংঘটিত হয় কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা, শুভাড্যা ও কালিন্দী ইউনিয়নে । ঢাকার আশে পাশের এলাকায় পাক বাহিনীর পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের মাঝে জিঞ্জিরার হত্যাযজ্ঞটিই প্রথম। এলাকাটি ছিল হিন্দুপ্রধান। আওয়ামীলীগের শক্ত ঘাটি হিসাবেও এর পরিচিতি ছিল। তাছাড়া ২৫ শে মার্চে ঢাকা থেকে পালিয়ে বহু মানুষ কেরানীগঞ্জ গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল স্থানীয় মানুষদের বাড়িতে। বিশেষ করে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী কেরানীগঞ্জ থেকে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতিও নিচ্ছিল। ২৬ মার্চেই কেরানীগঞ্জের থানার সব অস্ত্র লুট করে ছাত্রলীগের নেত কর্মীরা। অস্ত্র লুটে বাধা দিতে গিয়ে নিহত হয় অনেক অবাঙ্গালী পুলিশ।
এই কেরানীগঞ্জ দিয়েই তাজউদ্দীন আহমদ, আব্দুর রাজ্জাক সহ আওয়ামীলীগের প্রথম সারির বহু নেতা ঢাকা থেকে ভারতে গিয়েছিলেন।
কেরানীগঞ্জের মানুষ তখন ছিল ঘুমে অচেতন। তাদের ঘুম ভাঙ্গে পাকসেনাদের মর্টার শেল ও মেশিনগানের শব্দে। পাকি নরপশুরা কেরানীগঞ্জের নিরীহ জনগনকে হত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছিল রাতভর। কেরানীগঞ্জকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছিল যেন কোন লোক পালিয়ে যেতে না পারে। এই হত্যাযজ্ঞটি পরিচালনা করে কুখ্যাত পাক ব্রিগেডিয়ার রশিদ। মিটফোর্ড হাসপাতাল ও এর পার্শ্ববর্তী মসজিদের ছাদের উপর থেকে পাকসেনা অফিসাররা এই পরিকল্পিত নরহত্যাকে পরিচালনা ও পর্যবেক্ষণ করে । উল্লেখ্য যে, মসজিদের উপর থেকে ফ্লেয়ার ছুঁড়ে গনহত্যা শুরু করার জন্য সিগনাল দেওয়া হয়েছিল।
কেরানীগঞ্জে পৌঁছেই পাকসেনারা প্রথমে জিঞ্জিরা ও বড়িশুর বাজা্রে করডাইট পাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। মানুষ যে যে দিকে পারে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে প্রাণের ভয়ে। যে যেখানে পারে আত্বগোপণ করে। জনোয়ার পাকসেনারা চারদিক থেকে নির্বিচারে গুলি চালায় নারী পুরুষ সবার উপর, এমনকি মায়ের কোলের শিশুসহ মা-শিশু দু’জনকেই ঝাঁজড়া করে দেয় সয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে । পুড়িয়ে দেওয়া হয় গ্রামের পর গ্রাম । তুলে নেওয়া হয় যুবতী মেয়েদেরকে । সবচেয়ে অমানবিক ঘটনাটি ঘটে মান্দাইল ডাকের পুকুরের পারে। ষাট জন নিরপরাধ মানুষকে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করা হয়। পাশবিক অত্যাচার করে এগার জন মহিলাকে হত্যা করা হয় কালিন্দ গ্রামের এক বাড়িতে ( দৈনিক বাংলা, ১নভেম্বর ১৭৭২)। পুরো কেরানীগঞ্জ এলাকায় মৃত মানুষের দেহ বহুদিন রাস্তায়, ঝোপঝাড়ে, পুকুর পাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল । এই নয় ঘণ্টার পাশবিক গণহত্যায় দুই হাজারের বেশী নিরীহ মানুষ নিহত হয় ।
এই গনহত্যার বিষয়টি পাকিস্তান টেলিভিশনে ২রা এপ্রিল প্রচার করেস। বলা হয়েছিল, যে সব বিছিন্নতাবাদি ,দুস্ষ্কৃতিকারী কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় আশ্রয় নিয়েছিল পাক সেনা বাহিনী তাদের উপর সামরিক একশন নিয়েছে। ৩রা এপ্রিল মর্নিং সান পত্রিকা এই গনহত্যাকে নগ্ন সমর্থন দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছিল। উল্লেখ করা হয়েছিল যে এই সামরিক ব্যবস্হার মধ্য দিয়ে কেরানীগঞ্জকে মুক্ত করা হল দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে।
এক বালুচ সৈন্যর সাক্ষাতকারেও এই গণহত্যার কিছুটা নমুনা পাওয়া যায়-“
— লেখাটি সংগৃহীত।