নতুন সরকারের ১০০ দিন: আশার পাশাপাশি উদ্বেগও দেখছে টিআইবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমে একদিকে সম্ভাবনা ও আশার সঞ্চার হলেও অন্যদিকে সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগের কারণও রয়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)| রোববার (৭ জুন) বেলা ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়| সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি| প্রতিবেদনে টিআইবি বলছে, জুলাই অভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গণরায়ের মূল প্রত্যাশা ছিল সুশাসিত, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা| বিএনপির রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পূর্বশর্তও হলো সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ| অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও জন¯^াস্থ্য সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে| এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করা, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পরিহার, মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ঘোষণা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নজরদারি জোরদারের মতো পদক্ষেপ সরকারপ্রধানের সদিচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছে টিআইবি| তবে সংস্থাটি মনে করে, সরকারের কিছু পদক্ষেপ ও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বক্তব্য বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ| এতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের প্রকৃত অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন ˆতরি হয়েছে| টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টিকে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ ইতিবাচক| কিন্তু বিচার বিভাগের ¯^াধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি দমন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন বাতিল বা স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে পেছনের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে| একই সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব শক্তিশালী করে এমন বেশ কয়েকটি আইন অনুমোদন পেয়েছে| প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সুরক্ষা ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিতকরণে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি ˆতরি হয়েছে| টিআইবি আরও বলেছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা দৃশ্যমান| পুলিশ, প্রশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের অভিযোগও রয়েছে, যা নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী| আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং চাঁদাবাজি দমনের ঘোষণা সত্ত্বেও হাট-বাজার, পরিবহন খাত, বাস ও ট্রাকস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে| এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও রয়েছে| একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ˆবচিত্র?্যরে ওপর সহিংসতা এবং মুক্তচিন্তাবিরোধী কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি| বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও খাতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও সুশাসনের ঘাটতি, দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের অভাব, অব্যবস্থাপনা ও দলীয় প্রভাব কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে| সামগ্রিক মূল্যায়নে টিআইবি বলেছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিন একদিকে আশাজাগানিয়া ও সম্ভাবনাময় হলেও অন্যদিকে পরিবর্তনের উদ্যোগগুলো অনেক ক্ষেত্রে খণ্ডিত ও তাৎক্ষণিকধর্মী| ফলে সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনে এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে|