অর্থনীতির বর্তমান গতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি এবং সামনে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পেতে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে পারচেজিং ম্যানেজারস’ ইনডেক্স বা পিএমআই। সরকারি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের আগেই ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে এই সূচককে অর্থনীতির ‘আর্লি-ওয়ার্নিং’ বা আগাম সতর্কসংকেত হিসেবেও দেখা হয়।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানের পুলিশ প্লাজায় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে পিএমআই নিয়ে উপস্থাপিত একটি প্রেজেন্টেশনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে।
সেমিনারে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডাম অ্যাস্পডেন, এমসিসিআই মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহাম্মাদ এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও সিনিয়র ম্যানেজার হাসনাত আলম উপস্থিত ছিলেন।
পিএমআই মূলত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তন পরিমাপের একটি সূচক। এর আওতায় নতুন অর্ডার, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কাঁচামাল বা ইনপুটের দাম, সরবরাহকারীদের পণ্য পৌঁছানোর সময়, মজুত, অসম্পন্ন অর্ডার এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মতো বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মাসের তুলনায় তাদের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি উন্নত, অপরিবর্তিত নাকি অবনত হয়েছে— সে বিষয়ে তথ্য দেয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয় পিএমআই।
সাধারণ নিয়মে সূচকের মান ৫০-এর বেশি হলে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ এবং ৫০-এর নিচে থাকলে সংকোচন বোঝায়। ফলে একটি নির্দিষ্ট মাসে অর্থনীতির ব্যবসায়িক অংশে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, তা দ্রুত বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।
পিএমআইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো এর দ্রুত প্রকাশ। জিডিপি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যান প্রস্তুত ও প্রকাশ করতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। বিপরীতে পিএমআই দ্রুত পাওয়া যায়।
এ কারণে অর্থনীতির গতি হঠাৎ বদলে গেলে তার প্রাথমিক প্রতিফলন পিএমআইয়ে ধরা পড়তে পারে। নতুন অর্ডার ও উৎপাদন কমছে কি না, কর্মসংস্থানে দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে কি না কিংবা ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে কি না— এসব বিষয়ে আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেও পিএমআইয়ের ওঠানামায় বিভিন্ন ধরনের চাপের প্রভাব দেখা গেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন, কারফিউ এবং প্রায় ১০ দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এর প্রভাবে জুনের তুলনায় জুলাইয়ে পিএমআই ২৭ পয়েন্ট কমে ৩৬ দশমিক ৯-এ নেমে যায়। ৫০-এর নিচে নেমে যাওয়া সূচক তখন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য সংকোচনের চিত্র তুলে ধরে।
এর পর ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে দীর্ঘ সরকারি ছুটি, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কসংক্রান্ত চাপ এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতার প্রভাবে পিএমআই ৮ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে যায়।
একই বছরের অক্টোবর-নভেম্বর সময়েও সূচকে পতন দেখা যায়। বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হওয়া, রপ্তানি প্রতিযোগিতায় চাপ এবং জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে ওই সময়ে পিএমআই ৭ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমেছিল।
২০২৬ সালের মে-জুনেও সূচক কমে। দীর্ঘ ঈদের ছুটি, বর্ষার শুরু, ঈদের আগে চাহিদার দুর্বলতা এবং নতুন ১৫ শতাংশ ভ্যাটের প্রভাবে পিএমআই ৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৫২ দশমিক ৯-এ দাঁড়ায়। তবে সূচক ৫০-এর ওপরে থাকায় ওই সময়ে সামগ্রিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের পিএমআই প্রস্তুতের জন্য প্রতি মাসে চারটি খাতের মোট ৪০০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ করা হয়। এর মধ্যে কৃষি খাতের ৪৬টি, উৎপাদন খাতের ৯২টি, নির্মাণ খাতের ৫০টি এবং সেবা খাতের ২১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
নতুন অর্ডার থেকে শুরু করে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ইনপুটের মূল্য, সরবরাহের সময়, অসম্পন্ন কাজ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড—বিভিন্ন উপাদান এই জরিপে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে শুধু ব্যবসার বর্তমান অবস্থা নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ প্রত্যাশারও একটি ধারণা পাওয়া যায়।
সেমিনারে আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, পিএমআইয়ের সঙ্গে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোজোনে পিএমআই এবং জিডিপির সর্বশেষ অনুমানের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশ সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মহামারির আগের সময়ে ত্রৈমাসিক পিএমআই ও জিডিপির প্রথম অনুমানের মধ্যেও সম্পর্কের মাত্রা ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত ছিল বলে জানানো হয়।
এর অর্থ হলো, সরকারি জিডিপি তথ্য প্রকাশের আগেই পিএমআই দেখে অর্থনীতির সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি করা সম্ভব।
অর্থনীতির কোনো খাতে দীর্ঘ সময় ধরে নতুন অর্ডার, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমতে থাকলে তা সম্ভাব্য দুর্বলতার পূর্বাভাস দিতে পারে। বিপরীতে নতুন অর্ডার ও উৎপাদনে ধারাবাহিক উন্নতি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিতে পারে।
আবার উৎপাদন খরচ বা ইনপুটের দাম বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও আগে থেকে বোঝা যায়। সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলেও পিএমআইয়ের মাধ্যমে তার প্রাথমিক সংকেত পাওয়া সম্ভব।
এ ধরনের তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মুদ্রানীতি, শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত আরও সময়োপযোগীভাবে নিতে সহায়তা করতে পারে।
পিএমআইয়ের ব্যবহার শুধু সরকারি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, সরবরাহকারী নির্বাচন, দরকষাকষি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এ সূচকের তথ্য কাজে লাগাতে পারে।
একইভাবে শেয়ার ও বন্ডবাজার, বৈদেশিক মুদ্রা এবং পণ্যবাজারের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণেও পিএমআই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাজারে চাহিদা, উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যয়চাপের সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পাওয়ায় বিনিয়োগ সিদ্ধান্তেও এটি সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য খাতভিত্তিক পিএমআইয়ের পরিধি বাড়ানোর ওপরও সেমিনারে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক বা আরএমজি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) এবং সেবা খাতের জন্য আরও বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক পিএমআই তৈরি করা গেলে অর্থনৈতিক পূর্বাভাস আরও কার্যকর হতে পারে।
এ ছাড়া ব্যবসায়িক আস্থা সূচকের সঙ্গে পিএমআইকে সমন্বয় করা গেলে অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশাও আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে।
সেমিনারে অর্থনৈতিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা এবং নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়। নিয়মিত ও দ্রুত জরিপের মাধ্যমে ব্যবসায়িক খাতের পরিবর্তন ধরতে পারলে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত আরও তথ্যনির্ভর করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোজোন, চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতিতে নিয়মিত পিএমআই প্রকাশ ও বিশ্লেষণ করা হয়। সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে এই সূচক ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দ্রুত সংকেত পেতে পিএমআইয়ের ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা গেলে তা নীতিনির্ধারণ ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা—দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে অর্থনীতিতে আকস্মিক কোনো ধাক্কা এলে সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশের আগেই ব্যবসা খাতের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে এই সূচকের।