তিস্তা, ঘাঘট, করতোয়া, যমুনেশ্বরী, আলাইকুড়ি, মানাস, ধুম, চিকলি, বুল্লাই, নলেয়া, বুড়াইল, ইছামতি, শ্যামাসুন্দরী ও আখিরাসহ অসংখ্য নদ-নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে রংপুরের জনপদ। উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন এই জেলা শুধু নদী ও সবুজের জন্য নয়, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের স্মৃতিতেও সমৃদ্ধ।
‘বাহের দ্যাশ’ নামে পরিচিত রংপুরকে ঘিরে রয়েছে নানা গল্প ও ঐতিহ্য। ভাওয়াইয়ার সুর, কৃষিজীবনের সরলতা, প্রাচীন স্থাপনা আর মুক্তিযুদ্ধের আগের নানা আন্দোলনের স্মৃতি মিলিয়ে জেলাটি হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময় এক ভ্রমণ গন্তব্য।
ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি থেকে শুরু করে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্মভূমি—রংপুরের প্রতিটি প্রান্তেই যেন ইতিহাসের কোনো না কোনো অধ্যায় ছড়িয়ে আছে। উপমহাদেশের প্রাচীন সংবাদপত্রগুলোর একটি ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’-এর সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এ জনপদের ইতিহাস।
সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে রংপুরের জীবন ও যোগাযোগব্যবস্থা। তবে গ্রামীণ প্রকৃতির সেই চিরচেনা সৌন্দর্য এখনো টিকে আছে। শহরের কোলাহল পেরিয়ে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছুটলে চোখে পড়বে সবুজ মাঠ, মেঠোপথ, নদী, বিল আর পুরোনো স্থাপনা।
রংপুর শহর থেকে মিঠাপুকুরের দিকে এগোলেই পড়বে পায়রাবন্দ। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত এই এলাকা ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের।
রোকেয়ার বসতভিটার স্মৃতিচিহ্ন ঘুরে দেখার পাশাপাশি কাছেই দেখা যেতে পারে প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো মিঠাপুকুর লাল মসজিদ। সবুজ ধানখেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি স্থানীয়ভাবে ‘তিন কাতার মসজিদ’ নামেও পরিচিত।
রংপুরের ইতিহাসে মিঠাপুকুরের ফুলচৌকি গ্রামের গুরুত্বও কম নয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় এ অঞ্চল ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র।
পলাশীর যুদ্ধের পর রংপুর অঞ্চলে ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধে নেতৃত্ব দেওয়া নুরউদ্দিন বাকের জঙ্গের স্মৃতির সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্ক রয়েছে। কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের সৃষ্ট ‘নূরলদীন’ চরিত্রের পেছনেও ঐতিহাসিক এই ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ইতিহাসের সেই অধ্যায়ের স্মৃতি জানতে চাইলে ফুলচৌকি হতে পারে ভ্রমণতালিকার একটি গন্তব্য।
পীরগঞ্জের চতরা হাট পেরিয়ে এগোলেই দেখা মিলবে রাজা নীলাম্বরের দুর্গ বা নীল দরিয়ার দুর্গের ধ্বংসাবশেষের। বিশাল জলাধারকে ঘিরে থাকা স্থলভাগে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন স্থাপনার নানা চিহ্ন।
ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক নানা কাহিনির সঙ্গে পীরগঞ্জের সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীনকালে এ অঞ্চল কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
পীরগঞ্জে আরও রয়েছে পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সমাধি। পাশাপাশি আনন্দনগর বিনোদনকেন্দ্র, কবি হেয়াত মাহমুদের সমাধি, কবিলপুর জমিদারবাড়ির কাচারি, কাটাদুয়ার মাজার, বড় বড় বিল এবং কয়েকশ বছরের পুরোনো বৃক্ষও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
এ ছাড়া বাহাদুরপুর জামে মসজিদ, রায়পুর জমিদারবাড়ি ও দুর্গামন্দির এবং খালাশপীর মসজিদসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে এ উপজেলায়।
কাউনিয়ায় গেলে দেখা যেতে পারে রেল জংশন, তিস্তা রেল ও সড়ক সেতু এবং ধুম নদী। ভায়ারহাট শিবমন্দিরও রয়েছে দর্শনীয় স্থানের তালিকায়।
তারাগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে হাড়িয়ার কুঠির সরকারি উদ্যান, তারাবিবির মাজার, তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পের ক্যানেল এবং কালেক্টরেট বামনদিঘী ইকোপার্ক।
প্রকৃতি ও ইতিহাস—দুই ধরনের অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে এসব স্থান একসঙ্গে ঘুরে দেখা যেতে পারে।
পীরগাছা উপজেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইটাকুমারী রাজবাড়ি, মন্থনার জমিদারবাড়ি, কান্দি বান্নী এবং নব্দীগঞ্জ বধ্যভূমি। এসব স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় ইতিহাসের নানা অধ্যায়।
রংপুর শহরের অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা তাজহাট জমিদারবাড়ি। পুরোনো রংপুরের মাহিগঞ্জ-তাজহাট এলাকায় অবস্থিত এই স্থাপনাটি স্থাপত্যশৈলীর কারণে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
জমিদারবাড়ির সিঁড়িটি শ্বেতপাথরে তৈরি এবং ইতালি থেকে পাথর আনা হয়েছিল বলে জানা যায়। একসময় ভবনটি আদালত হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে এখানে রংপুর জাদুঘর পরিচালিত হচ্ছে।
ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য তাজহাট জমিদারবাড়ি তাই রংপুর ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য।
শতবর্ষী ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডিমলা কালীমন্দির। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও পূজাকে কেন্দ্র করে মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের সমাগম হয়।
বাংলা নববর্ষ, দুর্গাপূজা, অমাবস্যা, জন্মাষ্টমী, কোজাগরী লক্ষ্মীপূর্নিমা, দোলযাত্রা, শিবরাত্রি, রামনবমী, সরস্বতী পূজা ও দীপান্বিতা কালীপূজাসহ বিভিন্ন আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির এলাকা।
মাহিগঞ্জ, যা পুরোনো রংপুর নামেও পরিচিত, সেখানেও ছড়িয়ে আছে নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা। আফান উল্লাহর বাসভবন, আফান উল্লাহ জামে মসজিদ, বখতিয়ারি মসজিদ, গোসাঁইবাড়ি মন্দির এবং প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো মাহিগঞ্জ লাইব্রেরি এ এলাকার ঐতিহ্যের অংশ।
প্রকৃতি ও ইতিহাসের পাশাপাশি বিনোদন চাইলে রংপুরের গঞ্জিপুর এলাকার ভিন্নজগত হতে পারে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জায়গা।
সবুজে ঘেরা এই বিনোদনকেন্দ্রে রয়েছে দেশের প্রথম প্ল্যানেটারিয়ামগুলোর একটি, যেখানে সৌরজগত সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে আজব গুহা, তাজমহল, মস্কোর ঘণ্টা, আইফেল টাওয়ার ও চীনের প্রাচীরের আদলে তৈরি বিভিন্ন স্থাপনা।
শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা বিনোদনের ব্যবস্থা। ট্রেন, উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন আকর্ষণ পুরো জায়গাটিকে পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদনের উপযোগী করেছে। চাইলে সেখানে রাত কাটানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
ভিন্নজগতের কাছাকাছি গঙ্গাচড়া উপজেলায় দেখা যেতে পারে গজঘণ্টা জমিদারবাড়ি।
গঙ্গাচড়া উপজেলায় ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে রয়েছে কলি ও দলি আমিন বড়বিল পাকা জামে মসজিদ। বড়বিল মন্হনাহাটের কাছের মিয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদটি স্থানীয় স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি নিদর্শন।
সবুজ প্রকৃতির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো এই মসজিদ দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা আসেন।
রংপুর ভ্রমণের বিশেষত্ব শুধু দর্শনীয় স্থান দেখায় নয়; বরং এখানকার গ্রামীণ জীবন, ভাওয়াইয়া গান, নদী, মাঠ, মেঠোপথ ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়াতেও।
শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে বেরিয়ে পড়লেই বদলে যায় দৃশ্যপট। কোথাও নদী, কোথাও বিস্তীর্ণ ধানখেত, কোথাও শত বছরের পুরোনো স্থাপনা—ইতিহাস আর প্রকৃতির এমন সমন্বয় রংপুরকে উত্তরবঙ্গের ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আলাদা একটি গন্তব্য করে তুলেছে।