দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ বিভিন্ন সংস্থা এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইং-১-এর সংকলিত প্রকল্প-তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পে একদিকে যেমন থানা, ফায়ার স্টেশন, কারাগার ও নিরাপত্তা স্থাপনার অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হচ্ছে, অন্যদিকে সাইবার অপরাধ তদন্ত, ই-পাসপোর্ট, স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায়ও বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ হলো দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা ভবন কাম ব্যারাক নির্মাণ প্রকল্প। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৬ হাজার ২৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ২০২৭ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
পুলিশ অবকাঠামো উন্নয়নে আরেকটি বড় প্রকল্পের আওতায় থানা, পুলিশ ফাঁড়ি, তদন্ত কেন্দ্র, ক্যাম্প, নৌ-পুলিশ কেন্দ্র, রেলওয়ে পুলিশ স্থাপনা, পর্যটন পুলিশ কেন্দ্র এবং হাইওয়ে পুলিশ স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৭ হাজার ৭৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
বিশেষায়িত পুলিশিং ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতেও রয়েছে বড় বিনিয়োগ। বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম প্রিভেনশন সেন্টার প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৩ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
এ ছাড়া সরঞ্জাম সংগ্রহের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির পৃথক প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
ডিজিটাল নিরাপত্তাকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ‘সেফার সাইবারস্পেস ফর ডিজিটাল বাংলাদেশ: এনহ্যান্সিং ন্যাশনাল অ্যান্ড রিজিওনাল ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন ক্যাপাসিটি অব বাংলাদেশ পুলিশ’ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫৯০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
সরকারি অর্থায়ন ও প্রকল্প সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য সাইবার ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্তে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো।
বিশেষায়িত নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সক্ষমতা বাড়াতেও উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় বিনিয়োগ রয়েছে। র্যাব ফোর্সেস সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫ হাজার ৪৫৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এ ছাড়া র্যাবের পরিচালন, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পৃথক কয়েকটি প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে ৭৩টি কম্পোজিট ও আধুনিক বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) নির্মাণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এদিকে গাজীপুরে নবগঠিত ৬৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৩০ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। লজিস্টিকস ও নৌযান রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা স্থাপন এবং প্রতিস্থাপনযোগ্য নৌযান সংগ্রহের দুটি প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় যথাক্রমে ৭ হাজার ৫৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং ২৩ হাজার ১৪৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট অ্যান্ড অটোমেটেড বর্ডার কন্ট্রোল ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প (১ম সংশোধিত)।
এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৯ হাজার ৩৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২০২৮ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাসপোর্ট সেবাকে আরও ডিজিটাল করার পাশাপাশি আধুনিক ও কার্যকর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার মোকাবিলা এবং পুনর্বাসন সেবা সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আওতায় ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, সাত বিভাগীয় শহরে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ এবং জেলা কার্যালয় নির্মাণের মতো প্রকল্প রয়েছে।
সাত বিভাগীয় শহরে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ৪১৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০২৮ সালের জুন নাগাদ এটি শেষ হওয়ার কথা।
অন্যদিকে কারা অধিদপ্তর কয়েকটি কারাগারের সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন ও পুনর্নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, জামালপুর ও কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের পুনর্নির্মাণ, নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ এবং ঐতিহাসিক পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কমপ্লেক্সের সংরক্ষণ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার উন্নয়ন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর অ্যাম্বুলেন্স সেবা সম্প্রসারণ, নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, বিদ্যমান স্থাপনা পুনর্নির্মাণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক সুবিধা বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
২০টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৬৫০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১২টি নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ এবং আটটি পুনর্নির্মাণ করা হবে।
এ ছাড়া দুটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণে পৃথক একটি প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫ কোটি ১২ লাখ টাকা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৫টি চলমান প্রকল্পের চিত্রে দেখা যায়, নিরাপত্তা খাতে সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকার এখন শুধু প্রচলিত অবকাঠামো সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল অপরাধ তদন্ত, স্বয়ংক্রিয় অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থা।
কয়েকটি প্রকল্প ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ বড় প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অবকাঠামো ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জননিরাপত্তাসংক্রান্ত সেবা আরও কার্যকর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।