দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ সব প্রতিষ্ঠানই বিধ্বস্ত অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশ আমাদের সবার। আমরা বিরোধী দলে থাকলেও আমরা দায়িত্বহীন নই। আমাদেরও দায়িত্ব আছে।’ রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর মধুবাগ খেলার মাঠে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘৪–১০ অক্টোবর দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সপ্তাহ’ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশে শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থা নয়, কার্যত দেশের সব প্রতিষ্ঠান এখন বিধ্বস্ত অবস্থায় আছে। ব্যাংক, বিমা, করপোরেশন, স্টক মার্কেট আজকে মাটির সঙ্গে মিশে আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন। দিনে-দুপুরে, রাতে বিভিন্ন সময় যে সব অপকর্ম খোদ রাজধানীতে ঘটে চলেছে, যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে। রাজধানী যেখানে সরকারের কেন্দ্রীয় অবস্থান, এই অবস্থান থেকে বুঝা যায় সারাদেশের অবস্থাটা কী। খুবই উদ্বেগজনক!’ তিনি বলেন, ‘তিনদিন আগে ঢাকা এয়ারপোর্টে এয়ারপোর্টের সীমাহীন দুর্নীতি, অন্যায়-অপকর্মের প্রতিবাদ করার জন্য ’৭১-এর রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা, দু’বারের সাবেক এমপি, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর দেশের মানুষ যাকে সবাই চেনে, তিনি প্রতিবাদ করেছেন। কেন তাকে তার লাগেজটি পাওয়ার জন্য তিন ঘণ্টার অধিক সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে?’ জামায়াত আমির বলেন, ‘ওমরাহ ফিরে আসার সময় একটু জমজমের পানি তিনি এবং তার সঙ্গীরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। সেটা আলাদা করে তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা জিজ্ঞেস করেছেন, এই জমজমের পানির মালিককে যে এটা পরিত্যক্ত? তিনি বলেছেন, আমি চোর নই। আরেকজনের কষ্টার্জিত এবং ট্যাক্স দিয়ে আনা পানি আমি নিয়ে যাব, এটা আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। আমি পবিত্র পানি এনেছি আমার বিশ্বাসের জায়গা থেকে। আমার পানি দাও।’ তিনি বলেন, ‘প্রথমে বলা হয়েছে কনটেইনার মদিনায় রয়ে গেছে, আপলোড হয়নি। পরে যখন তিনি আরও গরম হয়েছেন, খোঁজ নিয়ে বলে যে কনটেইনার এসেছে, ভুলক্রমে আমরা দিতে পারিনি । বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন সংসদ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা এই সময় এসেছেন একসঙ্গে। তাদের সঙ্গে অশুভ আচরণ করা হয়েছে। কোনো সূত্র ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, ‘না তাকে উত্তেজিত করা হয়েছে, বাধ্য করা হয়েছে। তিনি কিছু কথা বলেছেন, কথা হয়তো অনেকের ভালো লাগেনি, নাও লাগতে পারে। কিন্তু যে বিষয়ে তিনি প্রতিবাদ করেছেন, তা ১০০ বার সত্য।’ ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি কথা বলেছেন ভুক্তভোগী প্যাসেঞ্জারদের জন্য। তিনি এই কথা বলেছেন আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকাকে যারা বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই সব খেটে খাওয়া প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্য। যাদের ব্যাগগুলো কেটে ব্যাগের ভেতর থেকে মূল্যবান সম্পদ সরিয়ে ফেলা হয়, চুরি করা হয়, তাদের জন্য কথা বলেছেন তিনি।’ তিনি বলেন, ‘সেই অপরাধে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তড়িঘড়ি করে এবং মিথ্যা মামলা হয়েছে। সেই মামলায় বলা হয়েছে তিনি একজনকে শারীরিকভাবে নাজেহাল করেছেন। এটা ১০০ ভাগ নয়, ১০০০ ভাগ মিথ্যা। তিনি কারো গায়ে হাত তোলেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আদালতে যখন আমাদের আইনজীবী জানতে চেয়েছে, কাকে মেরেছেন, তার প্রমাণ দেখান। এয়ারপোর্ট তো সম্পূর্ণ সিসি ক্যামেরার আওতায় আছে। আপনারা একটু দেখান। বলেছেন, না, ওই এলাকায় সিসি ক্যামেরা ছিল না। বুঝতে পারছেন বিষয়টা?’ জামায়াত আমির বলেন, ‘একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হাতকড়া পরানো হয়েছে। তাকে অপমান করার জন্য হেলমেট পরানো হয়েছে। অপমান করার জন্য তার বুকের জ্যাকেট ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা নিন্দা জানাই।’ তিনি বলেন, ‘এখন আর আপনি শুধু জামায়াতে ইসলামের লোক, নেতা নন। এখন আপনি সারা বাংলাদেশের ভুক্তভোগী, নির্যাতিত সব মানুষের নেতা হয়ে উঠেছেন।’ ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘মামলা হওয়ার পরে আমি তাকে ফোন করেছিলাম, আমরা অ্যান্টিসিপেটরি বেল নেব কিনা। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আমাকে বলেছিলেন, আমি অন্যায় করিনি, কাজেই আমি আত্মসমর্পণ করব না। আমি চাই আমাকে গ্রেপ্তার করা হোক। আমি চাই, প্রতিবাদের কারণে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এটা বাংলাদেশের কোটি মানুষ এজন্য দেখেছেন।’ ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘মানুষ হিসেবে আমরা কেউ ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নই। আমাদের এবং উনার কোনো ভুলত্রুটি থাকলে আল্লাহ তাও ক্ষমা করে দিন। এটাকে দেশবাসী হালকাভাবে নেবে না। তিনি যে প্রবাসীদের পক্ষে কথা বলেছেন, তারা এটাকে হালকাভাবে নেবে না।’ সরকারকে সতর্ক করে জামায়াত আমির বলেন, ‘একটা মেডিকেল সেন্টার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারেন না। সেখানে রাস্তার অন্ধকারে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হলো। তার সব সম্পদ উজাড় করা হলো। কারা এটা করলো? সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়লো?’ তিনি বলেন, ‘সেখানে জনপ্রতিনিধিরা আড়ালে-আবডালে থেকে, পাশে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। একজনকে জনগণের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য সংসদ সদস্য পদে পদত্যাগ করিয়েছেন। কিন্তু এই দুষ্কৃতিকারীকে এখনো দল থেকে বহিষ্কার করেননি। এখনো তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায়…আরও যারা দুষ্কৃতকারী, তাদেরকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনগণকে বোকা ভাববেন না, অন্ধ ভাববেন না। আপনাদের যদি একজনের দুটো করে চোখ থাকে, তাহলে জনগণের সূর্যের মতো দুটো চোখ আছে। পরিষ্কার করে সবকিছু দেখেন। আড়াল করতে পারবেন না। এখন আড়াল করার জমানা না। এখন মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু জনগণের দোরগোড়ায় হাতে-হাতে পৌঁছে যায়।’ ডেঙ্গু প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ডেঙ্গুর আগে হামেও অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে। আমরা যখন সংসদে এ সব বিষয়ে কথা বলি, তখন এমনভাবে জবাব দেওয়া হয় যে বাংলাদেশ এখন উন্নত বিশ্বের একটা দেশে পরিণত হয়েছে এবং এখানে কোনো সমস্যা নেই।’ ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ডেঙ্গুর জন্য ইতোমধ্যেই বিশ্বে প্রতিষেধক টিকা বাজারে আছে। এ বিষয়ে আমাদের সরকার কোনো উত্তর দেয়নি। ঠিক আছে, সরকারিভাবে যদি আনার তহবিল না থাকে, বেসরকারি রাস্তা ওপেন করে দেন। অন্তত মানুষ বাঁচার জন্য একটা অস্ত্র তো হাতে পাবে। নিজেও আনবে না, বাজারও খুলে দেবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কি দেখে বসে থাকব? জামায়াতে ইসলামী বসে থাকার সংগঠন নয়। আপনারা দেখেছেন, দেশে যখনই যে দুর্যোগ এসেছে, এটা আল্লাহর ইচ্ছা, আমরা সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি।’ ‘ডেঙ্গুকে আমরা একটা মহামারির মতো দেখছি। এজন্য আমরা এই সপ্তাহটা ঘোষণা করেছি। ঘোষণা করে কিছু লিফলেট বিতরণ করাই আমাদের কাজ না। আমরা জনগণকে সচেতন করব এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা ভূমিকা ইনশাআল্লাহ পালন করব।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা উত্তরে যাকে আমরা মেয়র প্রার্থী হিসেবে জনগণের প্রার্থী হিসেবে আপনাদের কাছে প্রেজেন্ট করছি, তিনি ইতোমধ্যে এই ধরনের কল্যাণমূলক, সচেতনতামূলক পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছেন। আপনারা দেখেছেন বিভিন্ন খাল, বদ্ধ নালা, যে সব জায়গা আছে, যেখানে মশার চাষ হয়, এডিস মশা যেখানে জন্ম নেয়, সেই জায়গাগুলো পরিচ্ছন্ন করতে তিনি অভিযান শুরু করেছেন। তাকে আমরা জনগণের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই।’ জামায়াত আমির বলেন, ‘আর যে যে পদক্ষেপ সামাজিক হওয়া দরকার, সবগুলো করুন। আক্রান্ত লোকদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। কোনো জায়গায় তারা যাতে চিকিৎসায় অবহেলার শিকার না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। দায়িত্ব পালন করলে সাধুবাদ জানাবো। না করলে অবশ্যই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা মোকাবিলা করা হবে।’ এসময় কেন্দ্রীয় ও মহানগর জামায়াতে ইসলামী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।