রাজধানীর সবুজবাগে সিফাত উল্লাহ (২৭) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নাজিফা শেখ নেহা নামে এক তরুণীর একাধিক প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এসেছে। পুরোনো ও বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
তবে সিফাত ও নেহার মধ্যে বিয়ের কথাবার্তা চলছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার দিন দুজনের একসঙ্গে মার্কেটে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।
সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, নেহা অনলাইনে পোশাক বিক্রি করতেন। সেই সূত্রেই সিফাতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ের বিষয়েও আলোচনা চলছিল।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সিফাতের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর আগে নেহার সাজিদ নামে আরেক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ওই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সিফাতের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান তিনি। পুরোনো সম্পর্কের বিষয়সহ বিভিন্ন দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদারটেক আদর্শপাড়া বরইতলা এলাকায় একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে নেহা আরেক তরুণীর সঙ্গে থাকতেন। রোববার সেখানে নেহার সঙ্গে দেখা করতে যান সিফাত।
কিছুক্ষণ পর দুই যুবক ওই বাসার দরজায় নক করে ভেতরে প্রবেশ করেন। তাদের সঙ্গে সিফাতের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে সিফাত বাসায় থাকা একটি ছুরি দিয়ে ওই দুই যুবককে আঘাত করেন। আহত দুজন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেন।
এরপর পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সিফাতও বাসা থেকে বের হয়ে দ্রুত মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন আহত দুই যুবকসহ আরও কয়েকজন তাঁর ওপর হামলা চালান এবং ছুরিকাঘাত করেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় সিফাতকে প্রথমে মুগদা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
সিফাতের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। মামলায় নেহাকে গ্রেপ্তার দেখানোর পাশাপাশি তাঁর সাবেক প্রেমিক সাজিদসহ মোট সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত নেহাকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সবুজবাগ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং হত্যাকাণ্ডে আরও কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নেহাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যসহ মামলার বিভিন্ন দিক তদন্ত করা হচ্ছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সবুজবাগের মাদারটেক আদর্শপাড়া বরইতলা এলাকায় নেহার বাসার সামনের সড়কে কয়েকজন সিফাতকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছিল, একটি ব্যাচেলর বাসায় সিফাতের প্রবেশকে কেন্দ্র করে সেখানে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরে সেই বিরোধ থেকেই হামলার ঘটনা ঘটে। এতে সিফাত ছাড়াও আরও দুজন আহত হন।
আহত দুজন হলেন রাজির রাব্বি (২৫) ও ইয়াসিন (২২)। তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর সেখান থেকে চলে যান।
সিফাতের বন্ধু হাসান জানান, মোটরসাইকেলে করে ওই তরুণীর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাসার সামনে গিয়েছিলেন সিফাত। একপর্যায়ে পরিস্থিতি খারাপ বুঝতে পেরে মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তখন কয়েকজন তাঁর ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত সিফাত উল্লাহ দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। কিছুদিন আগে দেশে ফেরার পর আবার কাতারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে পরিবার ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে।
সিফাতের বাড়ি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ধোলাইপাড় এলাকায়। তাঁর বাবার নাম জয়নাল আবেদীন।
অন্যদিকে নেহা সবুজবাগের উত্তর আদর্শপাড়া এলাকায় একটি ফ্ল্যাটে সাবলেট হিসেবে থাকতেন। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন বলেও জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে সিফাতের ময়নাতদন্ত করা হবে। ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।