গাজায় যখন একের পর এক ভবন ধসে পড়ছে, ধ্বংস হচ্ছে গ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, তখনও কিছু মানুষ চেষ্টা করছেন যুদ্ধের এই সময়টুকু ইতিহাসের পাতায় ধরে রাখতে। মানুষের ভয়, স্বপ্ন, ভালোবাসা, হারানোর বেদনা ও প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা যেন বিস্মৃত না হয়—সেই লক্ষ্যেই লেখক হুসাম মারুফ গড়ে তুলেছেন ‘গাজা পাবলিকেশনস’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।
১৪ আগস্ট প্রকাশিত এক লেখায় নিজের এই উদ্যোগের কথা জানান মারুফ।
যুদ্ধ শুরুর দিকে পরিবারের সঙ্গে রাফাহ শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। চারপাশে চলছিল গোলাবর্ষণ। প্রতিটি দিন কাটত অনিশ্চয়তার মধ্যে। যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যু হতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল তাঁর মনে।
তবে মৃত্যুভয়ই তাঁর একমাত্র উদ্বেগ ছিল না। নিজের লেখা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই যদি তিনি মারা যান, তাহলে তাঁর গল্প, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাগুলোও হয়তো হারিয়ে যাবে—এই আশঙ্কা আরও বেশি ভাবিয়ে তুলেছিল তাঁকে।
মারুফের উপলব্ধি, একজন মানুষের মৃত্যু আর তাঁর স্মৃতি মুছে যাওয়ার ঘটনা এক নয়। মানুষ মারা যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর জীবন, ভালোবাসা, ভয়, স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতার কোনো চিহ্ন যদি না থাকে, তাহলে ক্ষতিটা আরও গভীর।
যুদ্ধের মধ্যে গাজার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগারগুলো যখন ধ্বংস হচ্ছিল, তখন লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও প্রায় থেমে যায়। সেই পরিস্থিতিতে মারুফের মনে প্রশ্ন জাগে—এই সময়ের মানুষের গল্পগুলো তাহলে কে সংরক্ষণ করবে?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই জন্ম নেয় ‘গাজা পাবলিকেশনস’।
গাজার ভেতরে বই মুদ্রণের সুযোগ না থাকায় মারুফ সিদ্ধান্ত নেন, বইগুলো গাজার বাইরে ছাপানো হবে। তবে সম্পাদনা, নকশা ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজ যতটা সম্ভব গাজা থেকেই করা হবে।
একজন সম্পাদক, প্রুফরিডার, ডিজাইনার, বিপণনকর্মী এবং মুদ্রণ ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনকে নিয়ে তিনি ছোট একটি দল গড়ে তোলেন। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর আগে পরিচয়ও ছিল না। কিন্তু উদ্যোগটির প্রয়োজনীয়তা বুঝে তাঁরা স্বেচ্ছায় যুক্ত হন।
সীমিত সামর্থ্য নিয়েই শুরু হয় কাজ। তৈরি করা হয় একটি সাধারণ লোগো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ। এরপর যুদ্ধের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের জীবন, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা বই খোঁজা শুরু করেন তাঁরা।
‘গাজা পাবলিকেশনস’-এর লোগোতে রয়েছে একটি বালুঘড়ি। তবে সাধারণ বালুঘড়ির মতো সেখানে বালু নিচে নেমে যায় না। মাঝখানে একটি বাধা থাকায় বালু আটকে থাকে।
মারুফের কাছে এটি গাজার যুদ্ধকালীন জীবনের প্রতীক। তাঁর মতে, সেখানে সময় যেন থেমে গিয়েছিল। কাজ, পড়াশোনা, সামাজিক জীবন কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা—অনেক কিছুই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ কেবল বর্তমান মুহূর্তটি পার করার চেষ্টা করছিল।
প্রকাশনাটির প্রথম বই ছিল আমের আল-মাসরির ‘দ্য ম্যান হু লুকড ব্যাক’। শুধু বোমা হামলা নয়, যুদ্ধের মধ্যে মানুষের ভয়, পরিবার নিয়ে উদ্বেগ এবং নিজের পরিচয় ধরে রাখার সংগ্রামও উঠে এসেছে বইটিতে।
কিন্তু বইটি প্রকাশের দিনই মারুফ জানতে পারেন, বোমা হামলায় তাঁর এক কাজিনের মেয়ে ও তাঁর সন্তানরা নিহত হয়েছেন। একই দিনে তাঁকে সামলাতে হয় আনন্দ ও শোকের বিপরীত দুই অনুভূতি। একদিকে গাজা থেকে একটি বই পৃথিবীর পাঠকের কাছে পৌঁছানোর আনন্দ, অন্যদিকে একটি পুরো পরিবার হারানোর গভীর বেদনা।
সেদিনই তাঁর কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বই প্রকাশ কেবল সাহিত্যচর্চা নয়, মানুষের জীবন ও স্মৃতি সংরক্ষণেরও একটি মাধ্যম।
দ্বিতীয় বই ছিল রেহাম আল-সাবির উপন্যাস ‘আই অ্যাম অ্যাট ইউর ডোর’। যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনি নারীদের জীবন এতে উঠে এসেছে। বাস্তুচ্যুতি ও নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি যুদ্ধের মধ্যে দৈনন্দিন জীবনের ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ সংকটও তুলে ধরা হয়েছে।
স্যানিটারি প্যাড, সাবান, ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পুর মতো সাধারণ প্রয়োজনীয় জিনিসের সংকট কীভাবে নারীদের ব্যক্তিগত জীবন, গোপনীয়তা ও মর্যাদায় প্রভাব ফেলে, সেটিও উঠে এসেছে বইটিতে।
তৃতীয় বই ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য সি শু’। এর লেখক ফিলিস্তিনি লেখক বিসান নাতিল। শিশুদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা বইটিতে শরণার্থীশিবিরে বেড়ে ওঠা শিশুদের জীবনচিত্র উঠে এসেছে।
বাড়ি হারানো, বোমা হামলার আতঙ্ক, ক্ষুধা, পানির সংকট ও খেলাধুলার সুযোগ হারানোর মতো বড় সংকটের পাশাপাশি শিশুদের ছোট ছোট অনুভূতিও স্থান পেয়েছে বইটিতে।
‘গাজা পাবলিকেশনস’-এর কাজ চালাতে গিয়ে মারুফ ও তাঁর দলকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। কখনো ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেছে, কখনো দিনের পর দিন দলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
একবার দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দলের সদস্যরা এমনও ভেবেছিলেন, মারুফ হয়তো মারা গেছেন। পরে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হলে আবার শুরু হয় কাজ।
বইগুলো পোল্যান্ডে মুদ্রিত হয়েছে। এরপর জার্মানি, জর্ডান ও কায়রোর বিভিন্ন বিতরণকেন্দ্রের মাধ্যমে পাঠকদের কাছে পৌঁছেছে। মারুফ জানান, বইগুলো নিয়ে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
পরে নিজের পুরোনো বাড়ির জায়গায় ফিরে গিয়ে মারুফ দেখেন, পুরো বাড়িটিই ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের সামনে একটি বড় গাছ এবং তার পাশে ছোট আরেকটি গাছ তখনো দাঁড়িয়ে আছে।
ছোট গাছটির দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়, লেখাও অনেকটা এমন। লেখা যুদ্ধ থামাতে পারে না, হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। কিন্তু চারপাশের সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও মানুষের গল্প, স্মৃতি ও পরিচয়কে টিকিয়ে রাখতে পারে।
‘গাজা পাবলিকেশনস’-এর লক্ষ্যও তাই—যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে মানুষ যেন কেবল একটি সংখ্যা হয়ে হারিয়ে না যায়। তার জীবন, অনুভূতি, স্মৃতি ও গল্প যেন পৃথিবীর মানুষের কাছে থেকে যায়।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও সেই গল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন হুসাম মারুফ ও তাঁর সহযাত্রীরা।