শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, শিক্ষকদের পেশাগত জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান উন্নত করতে বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় শিক্ষকতার পাশাপাশি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এবং এমন কোনো পেশা বা কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয়ে সীমারেখা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। চাকরিতে থাকা অবস্থায় একজন শিক্ষক কী ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন বা পারবেন না, সেটিও সুনির্দিষ্ট করার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের নির্দেশনার পর সম্প্রতি আচরণবিধির খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। খসড়া পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে। ফলে এখনই কোন কোন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ বা সীমিত হবে, তা চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না।
শিক্ষার মান বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমানো, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরাতে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় মাধ্যমিক শিক্ষার সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হয়।
সভায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, কোচিংনির্ভরতা, স্মার্টফোনে আসক্তি এবং আনন্দময় শিক্ষার ঘাটতির মতো বিষয় উঠে আসে। পাশাপাশি শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান তদারকি, শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
আলোচনার পর শিক্ষার মানোন্নয়নে ১৫ দফা অনুশাসন দেওয়া হয়। ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সভার ‘রেকর্ড অব নোটস’ ও কার্যবিবরণী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)সহ শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা অনুশাসনের অন্যতম বিষয় শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্বে মনোযোগ বাড়ানো। এর অংশ হিসেবেই আচরণবিধি সংশোধন বা নতুন করে প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের স্থানীয় রাজনীতি ও দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব কাজে লাগিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, অতীতে কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি সময় দিয়েছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। এতে শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আচরণবিধিতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন বিধিমালায় দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা, রাজনৈতিক পদ-পদবি গ্রহণ, দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কিংবা শিক্ষকতার পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো বিষয়গুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, তা নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে খসড়া চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিও আচরণবিধি প্রণয়নের আলোচনায় এসেছে। কোনো শিক্ষক সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত না থেকেও জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হলে তার পেশাগত অবস্থান কীভাবে বিবেচনা করা হবে, সেটিও বিধিমালায় স্পষ্ট করা হতে পারে।
শুধু রাজনীতি নয়, শিক্ষকতার বাইরে অন্য পেশা বা ব্যবসায় যুক্ত থাকার বিষয়েও বিধিনিষেধ আসতে পারে। বিশেষ করে এমন কর্মকাণ্ড, যা নিয়মিত পাঠদান কিংবা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে, সেগুলোকে নতুন আচরণবিধির আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
শিক্ষকদের রাজনৈতিক ও শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতেও নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশব্যাপী সময়াবদ্ধ অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা রয়েছে।
মাউশির কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকদের তথ্য হালনাগাদ, ডিজিটাল ব্যবস্থায় পাঠদান পর্যবেক্ষণ এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে মনিটরিং জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সহকারী পরিচালকরা ‘ডিএমএস অ্যাপ’ ব্যবহার করে ভিডিও কলের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পর্যবেক্ষণ করবেন বলেও কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে।
শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে পরিবর্তনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি এসব বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা এবং ঝরে পড়া কমাতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন ও গণিত অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল ঢাকা পোস্টকে বলেন, শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আচরণবিধির উদ্দেশ্য শিক্ষকদের অযথা নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং শিক্ষকতার মর্যাদা রক্ষা, পেশাগত দায়িত্ব এবং জবাবদিহিতার একটি স্পষ্ট কাঠামো তৈরি করাই এর লক্ষ্য। শিক্ষকরা যেন নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদানে মনোযোগী হন এবং শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে কাজ করেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে চায় সরকার।
দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি আরও বলেন, আচরণবিধির পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পাঠদানের মানোন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভালো কাজের জন্য শিক্ষকদের উৎসাহ ও স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, উদ্যোগটির মাধ্যমে পেশাগত শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার পাশাপাশি শিক্ষকদের সক্ষমতা ও মর্যাদা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।