আজ ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস। চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে রোগীরা যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত ও প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির শিকার না হন, সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ২০১৯ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
রোগী নিরাপত্তার মূল কথা হলো চিকিৎসা গ্রহণের সময় অপ্রয়োজনীয় ও প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির ঝুঁকি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। হাসপাতাল, ক্লিনিক, চিকিৎসকের চেম্বার কিংবা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে একজন রোগী যেন সঠিকভাবে রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, যথাযথ চিকিৎসা এবং নিরাপদ পরিচর্যা পান—এটাই রোগী নিরাপত্তার প্রধান উদ্দেশ্য।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি যুক্ত হচ্ছে। উন্নত হচ্ছে চিকিৎসাব্যবস্থাও। তারপরও চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় ভুল রোগ নির্ণয়, ভুল ওষুধ বা মাত্রা প্রয়োগ, স্বাস্থ্যসেবাজনিত সংক্রমণ, ভুল রোগী শনাক্তকরণ, ভুল স্থানে চিকিৎসা কিংবা রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতির মতো কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। এসব ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন একটি শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা।
প্রতিবছর বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবসে রোগী নিরাপত্তার একটি নির্দিষ্ট দিককে সামনে আনা হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘Safe Care for Every Newborn and Every Child’, যার অর্থ—‘প্রতিটি নবজাতক ও প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ সেবা’।
এবারের প্রতিপাদ্যে নবজাতক ও শিশুদের চিকিৎসায় নিরাপত্তা, মানসম্মত পরিচর্যা এবং প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতি কমানোর বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিশু ও নবজাতকের চিকিৎসা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় আলাদা। তাদের বয়স, শারীরিক গঠন ও চিকিৎসাগত প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি চিকিৎসা ও পরিচর্যার প্রতিটি ধাপেই বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সামান্য ভুলও কখনো গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
একজন অসুস্থ মানুষ চিকিৎসকের কাছে যান সুস্থ হয়ে ফেরার প্রত্যাশায়। তাই চিকিৎসা নিতে গিয়ে যেন নতুন কোনো প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়তে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম দায়িত্ব।
রোগীর নিরাপত্তা কেবল চিকিৎসক বা নার্সের ওপর নির্ভরশীল নয়। রোগী, স্বজন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিরই এতে ভূমিকা রয়েছে।
চিকিৎসা শুরুর আগে রোগীর পরিচয় সঠিকভাবে নিশ্চিত করা, পূর্বের রোগের ইতিহাস ও অ্যালার্জির তথ্য জানা, বর্তমানে কোন কোন ওষুধ সেবন করছেন তা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। একইভাবে ওষুধ দেওয়ার আগে নাম ও মাত্রা পুনরায় পরীক্ষা করাও নিরাপদ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রোগী ও স্বজনদেরও চিকিৎসককে আগের রোগ, অ্যালার্জি, চলমান ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য স্পষ্টভাবে জানানো উচিত। চিকিৎসা বা ওষুধ সম্পর্কে কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে প্রশ্ন করাও তাদের অধিকার।
হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ রোগী নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও স্বজনদের নিয়ম মেনে হাত পরিষ্কার রাখা, সংক্রমণ প্রতিরোধের নির্দেশনা অনুসরণ এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে আদান-প্রদান করা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবার জন্য পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরিচ্ছন্ন কর্মপরিবেশ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং চিকিৎসা-প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণও গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসার সময় কোনো ভুল বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে শুধু দায়ী ব্যক্তি খোঁজার পরিবর্তে ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ চিকিৎসাজনিত সব ধরনের ক্ষতি হয়তো পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়, কিন্তু যথাযথ প্রটোকল, সতর্কতা ও কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক ঝুঁকি প্রতিরোধ করা যায়।
রোগী নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হলো সচেতনতা। নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে রোগী যত বেশি জানবেন, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে এবং কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে তা যথাযথভাবে জানাতে তত বেশি সক্ষম হবেন।
অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্বশীলতা, দলগত কাজ, স্বচ্ছতা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ চিকিৎসাজনিত ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস তাই কেবল একটি দিবস পালনের উপলক্ষ নয়। নিরাপদ চিকিৎসাকে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করার একটি স্মারকও এটি।
সচেতন রোগী, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, যথাযথ চিকিৎসা-প্রটোকল এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়েই এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে প্রতিটি রোগী নিরাপদ, মানসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।