প্রায় দেড়শ বছর আগে চার্লস ডারউইন যে অনুমান করেছিলেন, আধুনিক গবেষণায় এবার তারই সত্যতা মিলেছে। স্যাক্সিফ্রেগা গোত্রের একটি বিশেষ প্রজাতি যে সত্যিই পতঙ্গভুক, গবেষণার মাধ্যমে তার প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এত দিন এ বিষয়ে ডারউইনের ধারণা থাকলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি Nature Communications-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বিষয়টি উঠে এসেছে। চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের কুনমিং ইনস্টিটিউট অব বোটানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির গবেষকেরা যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করেন।
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, Saxifraga candelabrum নামের উদ্ভিদটি পোকামাকড় শিকার করে এবং সেগুলো থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে। গাছটি শিনহাই-তিব্বত মালভূমির দক্ষিণাংশ এবং চীনের ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশের হেংডুয়ান পর্বতমালার উঁচু এলাকায় জন্মায়।
গবেষকদের রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাছটি বিশেষ ধরনের গন্ধের মাধ্যমে মশা ও মাছির মতো পতঙ্গকে আকৃষ্ট করতে পারে। এরপর পাতার গায়ে থাকা আঠালো গ্রন্থিযুক্ত রোমে পোকামাকড় আটকে যায়।
শুধু পোকা আটকে রাখাই অবশ্য কোনো উদ্ভিদকে পতঙ্গভুক প্রমাণ করে না। এ ক্ষেত্রে গবেষকেরা আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পেয়েছেন। গাছটির মধ্যে থাকা ফসফাটেজ নামের এনজাইম আটকে পড়া পতঙ্গকে ভাঙতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, উদ্ভিদটি শুধু শিকার ধরে না, শিকার থেকে পুষ্টিও গ্রহণ করে।
স্যাক্সিফ্রেগা সবুজ উদ্ভিদ এবং সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে নিজের খাদ্য তৈরি করতে পারে। তারপরও পোকামাকড় শিকার করার পেছনে রয়েছে পরিবেশগত কারণ।
গাছটি সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮,২০০ থেকে ১০,৮০০ ফুট উচ্চতায় পাথুরে ও শুষ্ক এলাকায় জন্মায়। এসব স্থানে মাটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি, বিশেষ করে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম। ফলে মাটি থেকে পর্যাপ্ত নাইট্রোজেন সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই ঘাটতি পূরণ করতেই পতঙ্গ শিকার করে তাদের শরীর থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে গাছটি। গবেষণায় আইসোটোপ বিশ্লেষণের মাধ্যমেও এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। পতঙ্গের শরীরে থাকা নাইট্রোজেন-১৫ আইসোটোপ পরে উদ্ভিদের টিস্যুতে শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা।
১৮৭৫ সালে চার্লস ডারউইন স্যাক্সিফ্রেগা গোত্রের কয়েকটি উদ্ভিদ পর্যবেক্ষণ করে ধারণা করেছিলেন, এগুলোর কিছু প্রজাতি হয়তো পতঙ্গভুক হতে পারে। বিশেষ করে Saxifraga rotundifolia ও Saxifraga umbrosa-এর গায়ে থাকা আঠালো গ্রন্থিযুক্ত রোম তাঁর নজরে আসে। এসব রোমে পোকামাকড় আটকে যাওয়ার বিষয়টি তাঁকে এই ধারণার দিকে নিয়ে যায়।
তবে কোনো উদ্ভিদকে পতঙ্গভুক বলতে হলে শুধু পোকা আটকানো যথেষ্ট নয়; শিকার থেকে পুষ্টি গ্রহণের প্রমাণও প্রয়োজন। ডারউইনের সময়কার প্রযুক্তিতে সেই প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
গবেষণার প্রধান ও কুনমিং ইনস্টিটিউট অব বোটানির অধ্যাপক হ্যাং সানের মতে, এই আবিষ্কার আরও অনেক অজানা পতঙ্গভুক উদ্ভিদ শনাক্ত করার পথ খুলে দিতে পারে। ভবিষ্যতে এমন উদ্ভিদের নতুন বংশধারার সন্ধানও পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, স্যাক্সিফ্রেগা গোত্রের সব উদ্ভিদকে পতঙ্গভুক ধরে নেওয়া যাবে না। এই গোত্রের অনেক প্রজাতির গায়ে গ্রন্থিযুক্ত রোম এবং আঠালো পদার্থ থাকলেও সেগুলো সব সময় পোকামাকড় থেকে পুষ্টি সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো উদ্ভিদের আত্মরক্ষার ব্যবস্থার অংশও হতে পারে।
দেড় শতাব্দী আগে ডারউইনের করা একটি অনুমানকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সত্য প্রমাণ করার এই গবেষণা তাই উদ্ভিদের বিবর্তন ও অভিযোজন নিয়ে গবেষণায় নতুন প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে।