বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের সামগ্রিক চিত্র আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিদায়ক। ২০২৬ সালে দেশে মোট ধান উৎপাদন ৬ কোটি ১৯ লাখ টন হতে পারে, যা গত চার বছরের গড় ৫ কোটি ৯৫ লাখ টনের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। বোরো উৎপাদনও ভালো হয়েছে। একই সঙ্গে আউশের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১ লাখ টন।
দেশে উৎপাদন বাড়ায় চাল আমদানির প্রয়োজনও কমে আসছে। ২০২৫ সালে যেখানে প্রায় ১৯ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছিল, ২০২৬ সালে তা কমে প্রায় ৮ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। তবে উৎপাদনের এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালেই মানুষের খাদ্যে প্রবেশাধিকার ও ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বাংলাদেশ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার আইপিসি ফেস থ্রি বা সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়তে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ আইপিসি ফেস ফোর বা জরুরি অবস্থায় থাকতে পারে।
অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখন শুধু দেশে কত খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেই খাদ্য কতটা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্য নিরাপত্তা মূলত খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্য কেনার সক্ষমতা, খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশে বর্তমানে উৎপাদনের পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবিকার স্থিতিশীলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
এফএওর হিসাবে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে আইপিসি ফেস থ্রি বা তার ওপরে থাকা মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে। মে থেকে আগস্ট সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সামনে আনছে—খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি শুধু খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে তৈরি হচ্ছে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও জ্বালানি-সম্পর্কিত ব্যয়, জীবিকার ক্ষতি, বন্যা এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর সীমিত আয় একসঙ্গে মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে।
২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট সাধারণ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে এলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
তবে মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। আগের উচ্চমূল্যের ওপর নতুন করে দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগতে পারে।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক পরিবারগুলোকে খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন, জ্বালানি, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় একসঙ্গে বহন করতে হয়। ফলে বাজারে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকলেও তা কেনার সামর্থ্য না থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপেই জ্বালানির প্রয়োজন রয়েছে। সেচ, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ।
এফএও বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর উচ্চ জ্বালানি ও জ্বালানি-সম্পর্কিত ব্যয়ের চাপের কথা উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীকেন্দ্রিক সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে চাপ তৈরি করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু ভোক্তার ব্যয়ই বাড়ে না; কৃষকের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। ডিজেলচালিত সেচ, কৃষিযন্ত্র ও পরিবহনের বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের বাজারদরে প্রভাব ফেলে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি ও জ্বালানি ব্যয়ের স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসে কৃষির ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে আউশসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপরও জুলাইয়ে দেশে আউশের উৎপাদন প্রায় ৪১ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।
এটি বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। জাতীয় পর্যায়ে মোট উৎপাদন স্থিতিশীল থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য ও জীবিকার বড় সংকট তৈরি হতে পারে। কোনো অঞ্চলের কৃষক বন্যায় ফসল হারালে জাতীয় উৎপাদনের পরিসংখ্যানে তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম দেখা যেতে পারে। কিন্তু ওই কৃষক ও তাঁর পরিবারের খাদ্য, আয় ও জীবিকার ওপর এর প্রভাব হতে পারে ব্যাপক।
ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা মূল্যায়নে শুধু জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ নয়, মানুষের আয়, খাদ্যের দাম, স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর খাদ্যে প্রবেশাধিকার—সবগুলো বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
খাদ্য উৎপাদনে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবিকার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে তবেই এই উৎপাদনের সুফল সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।