ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ এবং জাতীয় গৌরবের প্রতীক। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সুশাসনের অভাব ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে এই গৌরবের প্রতীক আজ নানা সংকটের মুখে। ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ, নদীর অভয়াশ্রম রক্ষা এবং প্রকৃত জেলেদের পুনর্বাসন ও খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত করা। অথচ প্রকল্পটি ঘিরে ভুয়া বা ‘গায়েবি জেলে’ তালিকা এবং বরাদ্দের চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠছে। এর ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া সরকারি প্রকল্পে বিপুলসংখ্যক ভুয়া বা অস্তিত্বহীন জেলের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠে এসেছে। মা ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে প্রকৃত জেলেরা যখন জীবিকার সংকটে পড়েন, তখন তাঁদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল ও নগদ সহায়তা যদি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে না পৌঁছে, তাহলে তা শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় নয়—ইলিশ সংরক্ষণের পুরো ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দেয়।
প্রকৃত জেলেরা প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে নিষেধাজ্ঞার সময়ও নদীতে মাছ ধরতে বাধ্য হতে পারেন। এতে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের উদ্যোগ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে যার প্রভাব পড়তে পারে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতার ওপর।
এর প্রভাব সাধারণ মানুষের বাজারেও দৃশ্যমান। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই মাছ এখন অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে। উচ্চমূল্যের কারণে ইলিশ কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে। একই সময়ে দেশীয় বাজারের চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ইলিশ আমদানির ঘটনাও সামনে এসেছে। একসময় যে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি করত, সেই দেশের বাজারে আমদানি করা ইলিশের উপস্থিতি মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে ইলিশ সম্পদ রক্ষায় প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করতে বায়োমেট্রিক তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে একটি নির্ভুল, হালনাগাদ ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে। ভুয়া বা অস্তিত্বহীন জেলের নাম তালিকায় থাকলে তা দ্রুত যাচাই করে বাদ দিতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি বরাদ্দের চাল ও অর্থ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি অনিয়মে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তদন্ত ও শাস্তির ক্ষেত্রে পরিচয় বা প্রভাবের পরিবর্তে প্রমাণ ও আইনের শাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা খাদ্যসহায়তা ও নগদ অর্থ সরাসরি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপ কমানো সম্ভব। পাশাপাশি নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ ও জাটকা শিকার বন্ধে নদীতে নিয়মিত নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান জোরদার করা দরকার।
ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়; বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পদ সংরক্ষণে নেওয়া সরকারি প্রকল্প যদি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে তা শুধু একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়—দেশের মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপরও আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
তাই ইলিশ সম্পদ রক্ষায় এখন প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকৃত জেলেদের জন্য যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি সংরক্ষণব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও গৌরবের এই রূপালি সম্পদ ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।