শীতের আগমনী বার্তা জানান দিতেই ব্যস্ততা বেড়েছে মুন্সিগঞ্জের সবজি চারার বীজতলাগুলোতে। সারি সারি বীজতলায় যত্নে বেড়ে উঠছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, টমেটো, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজির চারা। স্থানীয় কৃষকদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব চারা এখন যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের কাছে। সংশ্লিষ্ট কৃষকদের হিসাবে, মাত্র তিন থেকে চার মাসের মৌসুমে এ খাত থেকে প্রায় ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে প্রতিবছর আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আগাম শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, টমেটো, বেগুন ও মরিচসহ বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদিত হয় এসব বীজতলায়।
মুন্সিগঞ্জের চারার চাহিদা এখন আর জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি সাভার, মানিকগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, রংপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা ও চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরাও এখান থেকে চারা কিনছেন।
সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের ভট্টাচার্যেরবাগ, কেপিবাগ ও সিকদার বাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ বীজতলা বাঁশের চাটাই দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এর নিচে সারিবদ্ধভাবে বেড়ে উঠছে টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, মরিচ, লাউ ও মিষ্টিকুমড়ার চারা।
কেউ চাটাই সরিয়ে চারায় পানি দিচ্ছেন, কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন। আবার কেউ নতুন বীজতলা তৈরিতে ব্যস্ত। প্রতিটি চারাকে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নিয়মিত পরিচর্যা করতে হচ্ছে কৃষক ও শ্রমিকদের।
চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতার আগে থেকেই মুন্সিগঞ্জে শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন ও বিক্রি হয়ে আসছে। তবে তখন এর পরিসর ছিল ছোট। মূলত জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় চারা বিক্রি করা হতো।
গত প্রায় দুই দশকে ধীরে ধীরে এ ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে। কৃষকেরা খৈল, জৈবসার ও প্রয়োজন অনুযায়ী রাসায়নিক সার ব্যবহার করে উন্নত জাতের চারা উৎপাদনে মনোযোগ দেন। একপর্যায়ে মুন্সিগঞ্জের চারার মান ও সুনাম দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
কৃষকদের দাবি, বর্তমানে পঞ্চসার, বজ্রযোগিনী ও রামপাল এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক চারা উৎপাদন প্রকল্প রয়েছে। এর বেশির ভাগই পঞ্চসার এলাকায়। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বীজতলায় চারা উৎপাদন শুরু হয়। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বিক্রি বাড়তে থাকে। কয়েক দফায় উৎপাদন ও বিক্রি চলতে থাকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
চারা উৎপাদনে সময়ের পাশাপাশি প্রয়োজন বাড়তি যত্ন। বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই চারা বিক্রি করতে হয়। অতিরিক্ত রোদ, বৃষ্টি কিংবা বীজতলায় পানি জমে গেলে চারার ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। তাই আবহাওয়া বুঝে বাঁশের চাটাই দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখেন কৃষকেরা।
শ্রমিক বাবু দেওয়ান বলেন, চারা উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। অঙ্কুরোদ্গমের ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যেই সাধারণত চারা বিক্রি করতে হয়। অতিরিক্ত রোদ ও বৃষ্টি চারার জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় দুপুর ও বৃষ্টির সময় বীজতলা ঢেকে রাখা হয়। আবার সকালে ও বিকেলে প্রয়োজন অনুযায়ী চাটাই সরিয়ে দেওয়া হয়। নিয়মিত পানি দেওয়া ও আগাছা পরিষ্কারের কাজও করতে হয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।
চারা উৎপাদন লাভজনক হলেও আবহাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় কৃষকদের। বিশেষ করে মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে একদিকে যেমন চারার ক্ষতি হয়, অন্যদিকে কমে যেতে পারে বিক্রিও।
কেপিবাগ এলাকার কৃষক স্বপন দেওয়ান বলেন, সবজি চাষের তুলনায় চারা উৎপাদন তাদের কাছে বেশি লাভজনক। প্রতিবছর তিন থেকে চার মাস ব্যাপকভাবে শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করেন তারা। এই মৌসুমের আয় দিয়েই পরিবারের পড়াশোনা ও সারা বছরের অনেক খরচ মেটানো সম্ভব হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, সদর উপজেলায় চারা উৎপাদন কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক কৃষি খাতে পরিণত হয়েছে। পঞ্চসার, রামপাল ও বজ্রযোগিনী ইউনিয়নে ২৫ থেকে ৩০ জন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন, যারা শুধু শীত মৌসুমেই নয়, বছরজুড়েই উন্নত ও মানসম্মত চারা উৎপাদন করছেন।
তার ভাষ্য, মুন্সিগঞ্জের চারার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যে বাজার তৈরি হয়েছে এবং চাহিদাও রয়েছে। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে চারা উৎপাদন করে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। এ কারণে নিয়মিত চারা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ।
মুন্সিগঞ্জের এই মৌসুমি চারা ব্যবসা এখন শুধু স্থানীয় কৃষির একটি অংশ নয়, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শীতকালীন সবজি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।