২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ নিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলিত মূল্য ফাঁস, দর বাড়ানো এবং ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগাভাগির অভিযোগ উঠেছে। বিষয়গুলো সত্য হলে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো মানসম্মত বই পৌঁছানো নিয়েও তৈরি হতে পারে অনিশ্চয়তা।
আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের প্রাক্কলিত মূল্য পরিবর্তন ও কাজ ভাগাভাগির কারণে শুধু মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপাতেই সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ২৫২ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলিত মূল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গোপনীয় তথ্য। দরপত্র জমা দেওয়ার আগেই কোনো দরদাতা এ তথ্য জানতে পারলে অন্যদের তুলনায় সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কারণ নির্ধারিত প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দর দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এবার দরপত্র প্রক্রিয়া চলার সময়ই বই ছাপার প্রাক্কলিত দর কিছু ঠিকাদারের কাছে পৌঁছে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও তথ্য ফাঁসের বিষয়টি স্বীকার করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে দরপত্র আহ্বানের পর প্রাক্কলিত মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, কাগজ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহনসহ বিভিন্ন উপকরণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্য পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হয়েছিল। তবে দরপত্রের মাঝপথে এ ধরনের পরিবর্তন বিধিসম্মতভাবে করা হয়েছে কি না, সেটি যাচাই করা জরুরি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাধ্যমিকের বই ছাপানোর ক্ষেত্রে প্রতি ফর্মার গড় কার্যাদেশের দর আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। বাজারে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব দরপত্রে পড়তে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে বাজার যাচাই ও স্বচ্ছ হিসাবের ভিত্তিতে দর নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, সেটিও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
দরপত্রে অংশগ্রহণের ধরন নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। প্রথম আলোর বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৮৫টি দরপত্রের মধ্যে ২৩১টিতে মাত্র একজন করে দরদাতা ছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠান দর জমা দিয়েছে। একই মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান আলাদা প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া দর জমা দেওয়ার আগে ঠিকাদারদের মধ্যে সম্ভাব্য দর নিয়ে আলোচনা এবং কে কোন কাজ পাবেন, তা ভাগাভাগির অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
পাঠ্যবইয়ের মান নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। অতীতে নিম্নমানের কাগজ ও ছাপার কারণে বই দ্রুত নষ্ট হওয়া কিংবা পাঠযোগ্যতা কমে যাওয়ার অভিযোগ এসেছে। তাই এবার কম প্রতিযোগিতায় কাজ দেওয়া হলে বইয়ের মান ঠিক রাখা সম্ভব হবে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়াও একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। সময়মতো বই সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনি সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্রয়প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
এ অবস্থায় প্রাক্কলিত মূল্য ফাঁসের উৎস, মূল্য পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত, একক দরদাতার সংখ্যা, প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা এবং কাজ ভাগাভাগির অভিযোগ—সবকিছুই স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের দরপত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
কারণ বিনা মূল্যের পাঠ্যবই প্রকল্পের অর্থ শুধু সরকারি বাজেটের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও শিক্ষাবর্ষের শুরুতে প্রয়োজনীয় বই হাতে পাওয়ার বিষয়টি সরাসরি জড়িত। তাই কম খরচে নয়, বরং স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যৌক্তিক ব্যয়ে মানসম্মত বই নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য।