কিছু মৃত্যু শুধু শোক তৈরি করে না, সমাজের সামনে একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্নও রেখে যায়। অপ্রতিমের মৃত্যুও তেমনই একটি ঘটনা। মাত্র ১৩ বছরের একটি শিশুকে হত্যা করেছে কয়েকজন কিশোর। যে বয়সে তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা, মাঠে খেলাধুলা করার কথা, স্বপ্ন দেখার কথা—সেই বয়সেই তারা জড়িয়ে পড়েছে সহিংসতায়।
প্রশ্নটা তাই শুধু অপ্রতিমকে কেন হত্যা করা হলো, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন—কীভাবে আমাদের কিশোরদের একটি অংশ এমন সহিংসতার দিকে যাচ্ছে?
অপ্রতিমের ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কিশোর গ্যাং এবং পারিবারিক নজরদারির বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার পর সে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কোন ধরনের ভার্চুয়াল গ্রুপে যুক্ত হচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতনতা কতটা, সেটিও ভাবার সময় এসেছে।
বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন শিশু-কিশোরদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, যোগাযোগ ও বিনোদনে এর ব্যবহার যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নানা ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
একজন শিশু যখন দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটায়, তখন সে শুধু বিনোদনমূলক কনটেন্টই দেখে না; তার সামনে সহিংসতা, অশালীনতা, অনলাইন হয়রানি, প্রতারণা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নানা উপাদানও আসতে পারে। বয়স অনুযায়ী মানসিক প্রস্তুতি ও পারিবারিক দিকনির্দেশনা না থাকলে এসবের প্রভাব তার আচরণে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বন্ধুমহল, স্থানীয় পরিবেশ, মাদক, অপরাধী চক্র এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা—সবকিছু মিলেই একজন কিশোরের আচরণ গড়ে ওঠে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে সংঘর্ষে জড়ানোর ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, পূর্ববিরোধ, মাদক, চাঁদাবাজি, মারামারি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রভাব প্রদর্শনের মতো নানা কারণে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়।
প্রযুক্তি এখানে অপরাধ সংগঠনের একটি হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা অন্য কোনো মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে তৈরি গ্রুপের মাধ্যমে দ্রুত অনেকজনকে একত্র করা সম্ভব। ফলে কোনো বিরোধ তৈরি হলে মুহূর্তের মধ্যে একটি বড় দল জড়ো হয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ প্রযুক্তি নিজে অপরাধের কারণ নয়; কিন্তু অপরাধী মানসিকতা বা সংঘবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত হলে প্রযুক্তি সেটিকে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
শিশুকে স্মার্টফোন দেওয়া এখন অনেক পরিবারের বাস্তবতা। পড়াশোনা, অনলাইন ক্লাস, যোগাযোগ কিংবা ব্যস্ততার কারণে অভিভাবকরাও অনেক সময় এটিকে প্রয়োজনীয় মনে করেন। কিন্তু ফোন দেওয়ার পর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় আরেকটি দায়িত্ব।
শিশু কার সঙ্গে কথা বলছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, রাতে কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করছে, অপরিচিত কারও সঙ্গে যোগাযোগ করছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকের খেয়াল রাখা জরুরি।
শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে সে ভয় না পেয়ে পরিবারের কাছে বিষয়টি বলতে পারে।
শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু শহুরে জীবনে খেলার মাঠ কমে যাওয়া, নিরাপদ বিনোদনের অভাব এবং পরিবারের ব্যস্ততা অনেক শিশুকে দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরে আটকে রাখছে।
ফলে বাস্তব জগতের বন্ধুত্ব ও খেলাধুলার জায়গা অনেক সময় দখল করে নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগত।
একটি শিশুর হাতে বই, খেলাধুলার সুযোগ ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি যদি শুধু একটি স্মার্টফোনই থাকে, তাহলে তার সামাজিক ও মানসিক বিকাশের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধকে কেবল অভিভাবকদের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। পরিবার, স্কুল, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামাজিক সংগঠন এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম—সব পক্ষকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব নিতে হবে।
শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা, বয়স উপযোগী কনটেন্টে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, অনলাইন হয়রানি ও অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
একই সঙ্গে কিশোর অপরাধীদের শুধু অপরাধী হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাদের পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং ও সংশোধনের ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ একজন কিশোরের অপরাধ যেমন একটি পরিবারের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে, তেমনি তাকে সংশোধনের সুযোগ না দেওয়াও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করতে পারে।
অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের সামনে কঠিন একটি বাস্তবতা তুলে ধরেছে—আমরা যেমন শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছি, তেমনি কিছু শিশুকে অপরাধের জগত থেকেও দূরে রাখতে পারছি না।
তাই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘শিশুর হাতে মোবাইল দেওয়া যাবে কি না’—এমন সরল সিদ্ধান্ত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, শিশুর হাতে প্রযুক্তি কীভাবে নিরাপদভাবে তুলে দেওয়া যায়।
প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভবও নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়। প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার, বয়সভিত্তিক সুরক্ষা, পারিবারিক নজরদারি এবং শিশুদের জন্য বাস্তব জীবনে পর্যাপ্ত বিকল্প তৈরি করা।
অপ্রতিমের মতো আর কোনো শিশুর জীবন যেন অকালে ঝরে না যায়—এটি যেমন আমাদের দায়িত্ব, তেমনি কোনো কিশোর যেন ঘাতকে পরিণত না হয়, সেটিও আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। একটি শিশুকে রক্ষা করা মানে শুধু তাকে বিপদ থেকে বাঁচানো নয়; তাকে এমন পরিবেশ দেওয়া, যেখানে সে সহিংসতা নয়, মানবিকতাকে বেছে নিতে শেখে।