ন্দরবনের গহিনে রাত নামলে যে বাঘ নিঃশব্দে জোয়ারের কাদায় পা ফেলে, কিংবা গারো পাহাড় ও চট্টগ্রামের বনভূমিতে হাতির পাল যে পথে শত শত বছর ধরে চলাচল করে—সেই পথ তাদের কাছে কেবল একটি রাস্তা নয়। সেটিই তাদের মানচিত্র, স্মৃতি ও বেঁচে থাকার ঠিকানা।
কিন্তু সেই পথ কেটে যখন সড়ক তৈরি হয়, বিদ্যুতের তার টানা হয়, বসতি গড়ে ওঠে কিংবা কৃষিজমি বিস্তৃত হয়, তখন প্রাণীদের চোখে পৃথিবীটা কেমন দেখায়? এই প্রশ্নই সামনে এনেছে এবারের বিশ্ব প্রাণী দিবস।
প্রতি বছর ৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী দিবস পালিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘See the World Through Their Eyes’, অর্থাৎ ‘ওদের চোখে পৃথিবীকে দেখো’। মানুষের সুবিধা-অসুবিধার হিসাবেই সাধারণত উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য যেন আমাদের একটু থামিয়ে প্রশ্ন করে—যার কোনো ভোটাধিকার নেই, মানুষের সঙ্গে বিনিময়ের ভাষা নেই, তার দৃষ্টিতে আমাদের উন্নয়ন কেমন?
মানবসভ্যতার ইতিহাস আসলে প্রাণীর সঙ্গে সহাবস্থানেরও ইতিহাস। হাজার বছর ধরে মানুষ কুকুরকে শিকারের সঙ্গী করেছে, গরু-মহিষকে কৃষিকাজে ব্যবহার করেছে। কৃষি থেকে পরিবহন, খাদ্য থেকে অর্থনীতি—মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে প্রাণীকুল ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের কৃষিজীবন, দুধ-ডিম-মাংসের পুষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ওপর নির্ভরশীল। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটিও শুধু খাদ্যাভ্যাসের পরিচয় নয়; এটি নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ের জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সম্পর্কের প্রতিফলন।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাতেও প্রাণীদের ভূমিকা অপরিসীম। মৌমাছি ও প্রজাপতি পরাগায়নে সহায়তা করে বলে ফসল উৎপাদন সম্ভব হয়। কাক, শকুন ও শিয়ালের মতো প্রাণী মৃতদেহ খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি রোগের বিস্তার কমাতে ভূমিকা রাখে।
বাদুড়, পাখি ও বানরজাতীয় প্রাণী বীজ ছড়িয়ে বন পুনর্জন্মে সহায়তা করে। কেঁচো মাটির উর্বরতা বাড়ায়। আর সুন্দরবনের বাঘ শীর্ষ শিকারি হিসেবে খাদ্যজালের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই সুন্দরবন আবার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে উপকূলীয় মানুষকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।
প্রাণী শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, মানুষের কল্পনা ও সংস্কৃতিকেও সমৃদ্ধ করেছে। সুন্দরবনে বনবিবির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা প্রকৃতির শক্তি ও বনের সঙ্গে সহাবস্থানের এক লোকজ প্রকাশ।
পাখির উড়ান মানুষকে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। পিঁপড়া ও উইয়ের সামাজিক সংগঠন থেকেও মানুষ নানা কৌশল ও ব্যবস্থাপনার ধারণা পেয়েছে। কবিতা, গান, রূপকথা, লোককাহিনি ও চিত্রকলায় প্রাণীরা যুগের পর যুগ মানুষের সৃজনশীলতার অনুপ্রেরণা হয়ে এসেছে।
তবুও এই সহযাত্রীদের অনেককেই আমরা পৃথিবী থেকে হারিয়ে ফেলছি। অনেক প্রজাতি এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের বৈশ্বিক লাল তালিকার সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, ১ লাখ ৭৫ হাজার ৯০৯টি প্রজাতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ হাজার ৫০৫টি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
অর্থাৎ মূল্যায়িত প্রজাতির প্রায় ২৮ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রায় হুমকির মুখে। তবে এই সংখ্যা পুরো চিত্র নয়। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের একটি ছোট অংশই এখন পর্যন্ত মূল্যায়নের আওতায় এসেছে। ফলে প্রকৃত সংকট আরও বড় হতে পারে।
বাংলাদেশের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০১৫ সালে আইইউসিএন বাংলাদেশ ও বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত রেড লিস্টে মোট ১ হাজার ৬১৯টি প্রজাতি মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্যে ৩৯০টি প্রজাতি বিভিন্ন মাত্রায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ছিল। এর মধ্যে ৫৬টি মহাবিপন্ন, ১৮১টি বিপন্ন এবং ১৫৩টি সংকটাপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
এ ছাড়া ৩১টি প্রজাতি বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। আরও ২৭৮টি প্রজাতির অবস্থা নির্ধারণের মতো পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। দেশ থেকে বিলুপ্ত প্রজাতির মধ্যে ছিল ১১টি স্তন্যপায়ী, ১৯টি পাখি ও একটি সরীসৃপ।
একসময় যেসব প্রাণী আমাদের বন, তৃণভূমি ও জলাভূমিতে বিচরণ করত, তাদের অনেককেই এখন শুধু বইয়ের পাতায় দেখা যায়।
বর্তমানেও আবাসস্থল ধ্বংস ও খণ্ডিত হওয়া, অবৈধ শিকার ও পাচার, নদী-জলাশয় দূষণ ও ভরাট, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রাণীদের অস্তিত্বকে সংকুচিত করছে।
একটি প্রজাতি হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রাণী হারায় না; খাদ্যজালের একটি সুতো ছিঁড়ে যায়, দুর্বল হয়ে পড়ে বাস্তুতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্কও।
একজন বন্যপ্রাণী গবেষকের দৃষ্টিতে সংরক্ষণ বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধাপ হলো প্রাণীর আচরণ, প্রয়োজন, ভয় ও বাসস্থানকে তার নিজের জায়গা থেকে বোঝা।
মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাতের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই প্রাণীকে ‘আক্রমণকারী’ এবং মানুষকে ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে দেখি। বাস্তবতা এতটা সরল নয়। সুন্দরবনের আশপাশে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের অসহনীয় বাস্তবতা যেমন সত্য, তেমনি প্রতিশোধ হিসেবে বাঘ হত্যার ঘটনাও বাস্তব।
দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে হাতির হানায় কৃষকের বছরের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়াও সত্য। আবার হাতির ঐতিহাসিক চলাচলের পথ যখন বসতি, কৃষিজমি, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোয় আটকে যায়, তখন সেই হাতিই খাবার ও চলাচলের পথের সন্ধানে মানুষের বসতিতে ঢুকে পড়ে।
চট্টগ্রামের বনাঞ্চল ও গারো পাহাড় যুগ যুগ ধরে হাতির চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এসব অঞ্চলে কৃষিজমি, বসতি, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর বিস্তারে হাতির বিচরণভূমি ও চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে।
তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—বাসস্থান ও খাবারের উৎস কমিয়ে দিয়ে তাদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা কতটা ন্যায্য?
বিশ্ব প্রাণী দিবসের ‘ওদের চোখে পৃথিবীকে দেখো’ বার্তাটি মূলত সেই প্রশ্নই সামনে আনে। উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হলে শুধু মানুষের প্রয়োজন নয়, প্রাণীদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনকেও পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। কারণ পৃথিবী শুধু মানুষের নয়; অসংখ্য প্রাণীরও এটি অভিন্ন আবাসভূমি।