রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সালমানের স্টুডিওতে হামলা: পুলিশ সাইন্সল্যাবে বিপুল পুলিশ, প্রস্তুত জলকামান ভবন গুঁড়িয়ে ধ্বংসস্তূপ, তবুও থামেনি টিকাদান আয় বাড়ছে, তবু স্বস্তি কোথায়? মূল্যস্ফীতির চাপে চাপে মধ্যবিত্ত সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ‘আমরা লজ্জিত’ বললেন ঢাবি ছাত্রদল নেতা ফেসবুকের তথ্যনীতি নিয়ে মেটার বক্তব্য ‘বিভ্রান্তিকর’, জুরি রায় চাপ নয়, দ্বিপক্ষীয় স্বার্থেই বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত: মাহাদী আমিন শাহ আলী থানার ওসি প্রত্যাহার জয়ার ‘আনপ্ল্যানড’ হাসিতে মুগ্ধ নেটিজেন, লুকে যেন বয়স থমকে আছে আয়ারল্যান্ড-ইসরায়েল ম্যাচ ঘিরে বিভেদ, বলল ইসরায়েল—‘ফুটবলই জয়ী হয়েছে’

আয় বাড়ছে, তবু স্বস্তি কোথায়? মূল্যস্ফীতির চাপে চাপে মধ্যবিত্ত

ইমরোজ শাহেদ
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

একটি দেশের অর্থনীতির চিত্র শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি বোঝা যায় না। অর্থনীতির বাস্তব প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেটে। মাস শেষে আয় থেকে খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল মেটানোর পর কতটুকু অর্থ হাতে থাকছে—সেখানেই ধরা পড়ে মানুষের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সেই মাসিক হিসাব ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় বাড়লেও ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—নামমাত্র আয় বাড়ার পাশাপাশি মানুষের হাতে থাকা অর্থের প্রকৃত মূল্য কতটা বাড়ছে?

জ্বালানির দাম বাড়লে প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে দেশে নতুন দামে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। চলতি বছরে এপ্রিল ও জুনের পর এটি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর তৃতীয় দফা।

জ্বালানির দাম সমন্বয়ের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে পরিবহন ও শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আর্থিক অবস্থার মতো বিষয় বিবেচনায় রয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিপিসির নিট মুনাফা ছিল প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। তবে চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

তবে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বিপিসির হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ডিজেলের দাম বাড়লে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়তে পারে। কৃষিতে সেচের খরচ এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। বাড়তে পারে পণ্য বাজারজাতকরণের খরচও। এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়তে পারে।

অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেনের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের ওপর। ফলে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণকে শুধু রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভারসাম্যের বিষয় হিসেবে দেখলে এর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাবের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।

মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু দাম কমেনি

আগস্ট ২০২৬-এ দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়ালেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হচ্ছে, আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে।

কয়েক বছর ধরে খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় যদি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও আগের ক্রয়ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসে না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য থাকলেও অনেক পরিবারের মাসিক বাজেটে তার স্বস্তি তৎক্ষণাৎ দৃশ্যমান নাও হতে পারে।

নতুন বেতন স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ছে

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ৩১ আগস্ট ২০২৬ সরকার জাতীয় পে স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করেছে, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।

নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডে ন্যূনতম মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সব ভাতা পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারি বেতন ও ভাতা খাতে বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

সরকারি কর্মচারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সমন্বয়ের একটি উদ্যোগ। কিন্তু সরকারের জন্য এর সঙ্গে আরেকটি বড় প্রশ্নও রয়েছে—এই অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থায়ন কীভাবে হবে?

রাজস্ব আদায় না বাড়লে ব্যয় সংকোচন, অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ, ঋণ গ্রহণ কিংবা সরকারের অন্যান্য খাতে ব্যয় পুনর্বিন্যাসের মতো পথ বিবেচনায় আসতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক চাহিদা বাড়লে উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বেতন বৃদ্ধির প্রভাব বুঝতে এর অর্থায়ন ও সামষ্টিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

বেসরকারি চাকরিজীবীদের সামনে বড় প্রশ্ন

সরকারি কর্মচারীদের বেতন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সমন্বয় করা সম্ভব হলেও দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে একই ধরনের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়ের ব্যবস্থা নেই।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাও কাঁচামালের মূল্য, জ্বালানি ব্যয়, ঋণের সুদ, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং বাজারের চাহিদার মতো বিভিন্ন চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একই হারে কর্মীদের বেতন বাড়ানো সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম ছিল।

এই ব্যবধানই অনেক বেসরকারি চাকরিজীবীর প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

মধ্যবিত্তের বাজেট সংকুচিত হচ্ছে

মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ অনেক সময় সরাসরি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। তারা সাধারণত সরকারি সামাজিক নিরাপত্তার সরাসরি বড় সুবিধাভোগী নন, আবার উচ্চ আয়ের মানুষের মতো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে দ্রুত আয় সমন্বয় করার সক্ষমতাও তাদের থাকে না।

ফলে ব্যয় সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবার প্রথমে সঞ্চয় কমায়। এরপর বিনোদন, ভ্রমণ বা অন্যান্য ঐচ্ছিক খরচ কমানো হয়। পরিস্থিতি আরও কঠিন হলে খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা বাসস্থানের ক্ষেত্রেও কাটছাঁট করতে হয়। কোনো কোনো পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে বা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

এর প্রভাব শুধু পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত পরিবার যদি একসঙ্গে ব্যয় কমাতে শুরু করে, তাহলে বাজারে ভোক্তা চাহিদাও দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে গেলে ব্যবসা ও শিল্পের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।

শুধু সুদের হার বাড়ালেই সমাধান নয়

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পেছনে সরবরাহ ও ব্যয়-সংক্রান্ত বিভিন্ন কারণও রয়েছে। জ্বালানি, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি—সবকিছুই দেশের অভ্যন্তরীণ দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু সুদের হারকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে একদিকে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব পড়লেও অন্যদিকে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

প্রয়োজন হতে পারে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, জ্বালানি মূল্য ব্যবস্থাপনা, বাজার তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা—সবগুলোকে সমন্বিতভাবে দেখার।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা মানুষের হাতে কত টাকা থাকছে

অর্থনীতির বড় বড় সূচক উন্নতির দিকে গেলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন তখনই স্পষ্ট হয়, যখন আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কিছুটা স্বস্তি দেয়।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় একদিকে প্রয়োজনীয় আয়-সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয়ের বৃদ্ধি সেই বাড়তি আয়ের একটি অংশ আবার শুষে নিতে পারে। আর বেসরকারি খাতের কর্মীদের ক্ষেত্রে আয় সমন্বয়ের সুযোগ তুলনামূলকভাবে অনিশ্চিত।

তাই বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর প্রশ্ন নয়; মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, জ্বালানি নীতিতে ভারসাম্য আনা এবং সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের কর্মীদের আয়কে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সক্ষমতা তৈরি করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি

এ বিভাগের আরো সংবাদ

আজকের নামাজের সময়সুচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ
  • ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
  • ১৬:১১ অপরাহ্ণ
  • ১৭:৫৬ অপরাহ্ণ
  • ১৯:০৯ অপরাহ্ণ
  • ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ
©2026 All rights reserved
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102