রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। লুট হয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও টিকা। মূল কেন্দ্রটি এখন বন্ধ থাকলেও থেমে নেই স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। ধ্বংসস্তূপের পাশের একটি সরু গলিতে অস্থায়ীভাবে টেবিল-চেয়ার বসিয়ে শিশুদের টিকাদানসহ সীমিত পরিসরে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, কেন্দ্রটির প্রধান ফটক বন্ধ। ভেতরে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা ভবনের ইট, কাঠামো ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ। ফটকের বাইরে অস্থায়ীভাবে বসানো হয়েছে টেবিল-চেয়ার। সেখানেই স্থানীয় মায়েরা শিশুদের নিয়মিত টিকার পাশাপাশি চলমান হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচির টিকা দিচ্ছেন।
কেন্দ্রটির ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখতে সকাল থেকেই সেখানে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দারাও।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মুখোশধারী প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কেন্দ্রটিতে হামলা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবন ভেঙে ফেলে। পরে এসি, ফ্রিজ, ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা, আসবাবসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কয়েকটি ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়।
হামলার পর কেন্দ্রের জায়গায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ লেখা সাইনবোর্ড ও ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।
১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অংশীদারত্বে এলাকার দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত নারী-শিশুদের বিনামূল্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। এর মধ্যে টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা অন্যতম।
কেন্দ্রটির কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জমি দখলের উদ্দেশ্যেই হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছে।
দুই বছর বয়সী ছেলে জায়ান চৌধুরীকে হামের টিকা দিতে কেন্দ্রে এসেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম চৌধুরী। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ছোটবেলায় তাঁর বাবাও তাঁকে এই কেন্দ্র থেকে টিকা দিয়েছিলেন। পরে নিজের বড় ছেলেকেও এখান থেকেই টিকা দিয়েছেন।
নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে এলাকার মানুষ এই কেন্দ্র থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আসছেন। হঠাৎ কেন্দ্রটি ভেঙে ফেলার ঘটনায় তিনি ও স্থানীয়রা কষ্ট পেয়েছেন। তাঁর দাবি, দ্রুত কেন্দ্রটি সংস্কার করে আগের মতো স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হোক।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ করা হবে না।
তিনি জানান, বর্তমানে ইপিআইয়ের আওতাধীন সব টিকাদান কার্যক্রম চালু রয়েছে। তবে পরিবার পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় সামগ্রী লুট হয়ে যাওয়ায় ওই সেবা আপাতত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
নারীরা পরিবার পরিকল্পনা-সংক্রান্ত সেবা নিতে এলে চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে তাদের ফেরত পাঠাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
ডা. নাসরিন আখতার আরও বলেন, কেন্দ্রের গেটে দেওয়া সিলগালা খুলে দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। সেটি খুলে দেওয়া হলে ভেতরে আবার স্বাভাবিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
তাঁর ভাষায়, বাইরে অস্থায়ীভাবে বসে কতদিন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে, তা নিশ্চিত নয়। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান সুযোগের মধ্যেই টিকাদানসহ জরুরি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।