কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা দ্রুত বাড়ছে। তবে প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থা একই গতিতে এগোতে পারছে না বলে সতর্ক করেছেন এআই নিয়ে কাজ করা বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন গবেষক।
গবেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এমন কোনো এআই ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে, যা নিজের সক্ষমতা নিজেই বাড়ানোর পর্যায়ে পৌঁছাবে। সে ক্ষেত্রে একসময় সেটি মানুষের বোঝার ও নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। সম্ভাব্য এ ঝুঁকি কমাতে এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে গতি কিছুটা কমিয়ে নিরাপত্তা পরীক্ষা ও ঝুঁকি মূল্যায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওপেনএআই ও গুগল ডিপমাইন্ডের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মী প্রকাশ্যে এআইয়ের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। এআই নিরাপত্তাবিষয়ক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান প্যালিসেড রিসার্চ তাদের বক্তব্য ভিডিওতে ধারণ করে ‘ফ্রমইনসাইড ডট এআই’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে।
গবেষকদের বক্তব্য, তাদের উদ্বেগ কোনো প্রচারণা বা বিপণন কৌশলের অংশ নয়। বরং এআইয়ের সম্ভাব্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়েই তারা বাস্তব আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, অনেক এআই গবেষণাগারে নতুন ও শক্তিশালী মডেল তৈরির বিষয়টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে বেশি গুরুত্ব ও স্বীকৃতি পাচ্ছে।
ওপেনএআই ও গুগল ডিপমাইন্ড—দুই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা গবেষক এবং বর্তমানে এআই নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান রেজল্যুশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিজ্ঞানী জিওফ্রি আরভিং বলেন, এআইয়ের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। এ বিষয়ে শুধু তাকে নয়, পুরো এআই গবেষণা ক্ষেত্রকেই আরও খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন আরও শক্তিশালী ও স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থা তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখনই এই সতর্কবার্তা সামনে এলো। সাম্প্রতিক সময়ে এআই উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীনভাবে নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করা নিয়ে প্রযুক্তি খাতের ভেতরেও আলোচনা বেড়েছে।
রয়টার্সের আরেক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের কর্মীদের মধ্যেও উন্নত এআই ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং সেগুলোর ওপর বিদ্যমান নজরদারি কতটা কার্যকর—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে কিছু এআই এজেন্ট মানুষের প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে অন্য সিস্টেমে প্রবেশ করার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখন শুধু গবেষণাগারকেন্দ্রিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ২৯ সেপ্টেম্বর শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীরা এআইয়ের জন্য স্বেচ্ছামূলক নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরির বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। প্রস্তাবিত কাঠামোয় স্বাধীন নিরীক্ষকের মাধ্যমে এআই সিস্টেম পরীক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার কথা রয়েছে।
গবেষকদের মূল উদ্বেগের জায়গা হলো, এআই যত বেশি স্বয়ংক্রিয় ও স্ব-উন্নয়নক্ষম হয়ে উঠবে, তার বিকাশের গতি এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার মধ্যে কোনো ব্যবধান তৈরি হচ্ছে কি না। তাদের মতে, ভবিষ্যৎ এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই ভারসাম্যই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।