জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিরাপত্তা পরিষদে ব্যাপক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। ভাষণে তিনি বলেন, ১৯০টির বেশি দেশের মতামত মাত্র পাঁচটি দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকা কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়। তার মতে, নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো বিশ্ববাসীর আস্থা অর্জনেও ব্যর্থ হয়েছে।
এরদোয়ান বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ৮১ বছর আগে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সংস্থাটি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না। এ কারণে নিরাপত্তা পরিষদকে আরও বিস্তৃত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল করার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন। বর্তমান পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। এরদোয়ান এই কাঠামোর পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
ভাষণের বড় অংশজুড়ে ছিল গাজার পরিস্থিতি। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান মানবিক সংকটের সমালোচনা করে এরদোয়ান বলেন, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধ থাকা কোনো মানুষের পক্ষেই গাজার পরিস্থিতি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে যেসব দেশ এখনো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট।
গাজার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে এরদোয়ান এটিকে ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে অমানবিক ও লজ্জাজনক আটক শিবির’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হিসেবে মেনে না নিয়ে যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সরাসরি উপস্থিত হতে না পারার বিষয়টিও বক্তব্যে তুলে ধরেন এরদোয়ান।
তিনি বলেন, টানা দুই বছর আব্বাস সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকক্ষে নিজের নির্ধারিত আসনে উপস্থিত থাকতে পারেননি। এরদোয়ানের ভাষায়, ফিলিস্তিনিদের প্রতি এ ধরনের আচরণ বিশ্ব বিবেককে আঘাত করে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অবশ্য ১৭ সেপ্টেম্বর একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে, যার মাধ্যমে ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টের পূর্বধারণকৃত বক্তব্য ভার্চুয়ালি প্রচারের সুযোগ দেওয়া হয়।
এরদোয়ান বলেন, আব্বাস সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও তুরস্ক ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলে যাবে।
তুরস্ক শুরু থেকেই গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে আসছে। আঙ্কারা ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এ ধরনের গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও ২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী ভাষণে গাজার ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের কথা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান টিকিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
এরদোয়ানের এবারের বক্তব্যে তাই ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, গাজায় যুদ্ধ বন্ধ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার—এই তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।