দীর্ঘ ২৩ বছরের সামরিক উপস্থিতির পর ইরাক থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আজ বুধবার দেশটির বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহারের শেষ ধাপ শুরু হচ্ছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে ইরাকে আর কোনো বিদেশি সেনার উপস্থিতি থাকবে না বলে জানিয়েছে ইরাকি সরকার।
মার্কিন সেনাদের এই প্রত্যাহারকে ইরান ও তাদের মিত্ররা নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখালেও, এর পেছনের সিদ্ধান্তটি নতুন নয়। ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ই ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে।
গত ১২ আগস্ট ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশটিতে থাকা সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে। নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী আজই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে এই প্রক্রিয়ার।
ইরাকি সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, ইরাকে ইসলামিক স্টেট (আইএস)বিরোধী আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক অভিযান শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিদেশি সেনাদের ইরাক ছাড়ার বিষয়টি নির্ধারিত ও চূড়ান্ত। ফলে ১ অক্টোবরকে ইরাকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টি ইরাকের প্রধানমন্ত্রী ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডারের বৈঠকের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়। এর আগে গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি ওয়াশিংটন সফরের সময় ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছিল।
ইরাকি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর দুই দেশ নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক স্বার্থের প্রতি সম্মান রেখে সম্পর্ক এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি অর্থনীতি ও নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। অভিযানের প্রায় নয় মাস পর গ্রেপ্তার হন সাদ্দাম হোসেন।
বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী এরপর ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও দেশটিতে নতুন করে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়।
বিশেষ করে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের উত্থানের পর জঙ্গিগোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা এবং ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা দিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রাখে ওয়াশিংটন।
২০২০ সালের পর থেকে ইরাকে মার্কিন সেনাদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হচ্ছিল। সর্বশেষ দেশটির বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। প্রত্যাহারের সর্বশেষ ধাপে তাদের শেষ দলটিও ইরাক ছাড়ছে।
দুই দশকের বেশি সময়ের উপস্থিতিতে ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করতে অর্থ সহায়তার পাশাপাশি ইরাকি বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণও দিয়েছে মার্কিন সেনারা।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে ইরাকের অনেক মানুষের মধ্যে স্বস্তি থাকলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন বাহিনী সরে যাওয়ার পর সশস্ত্র ও জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি সতর্ক করে বলেছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের শূন্যতা তৈরি হলে তা বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা থেকেই এমন আশঙ্কার ভিত্তি রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ফলে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটলেও, দেশটির নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব আগামী দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।