লাইফস্টাইল ডেস্ক:
সন্তানকে রাতে ঘুম পাড়ানো অনেক বাবা-মায়ের কাছেই প্রতিদিনের বড় চ্যালেঞ্জ। একইভাবে সকালে ঘুম থেকে ওঠাতেও কম ঝামেলা পোহাতে হয় না। শিশুর ঘুমের অনিয়ম শুধু তার ওপরই প্রভাব ফেলে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পুরো পরিবারের ঘুমের রুটিন।
অনেক অভিভাবক শিশুর ঘুমের সমস্যার জন্য মোবাইল ফোন কিংবা সন্তানের জেদকে দায়ী করেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এসব কারণ নয়—শিশু দিনের শেষ ভাগে কী করছে, বিশেষ করে ঘুমানোর আগের সময়টুকু কীভাবে কাটাচ্ছে, সেটিও তার ঘুমের সময় ও মানের ওপর প্রভাব ফেলে।
তাই ঘুমের আগে কয়েকটি অভ্যাসে পরিবর্তন আনলে শিশুর ঘুমের রুটিন অনেকটাই সহজ হতে পারে।
মোবাইল ফোন, ট্যাব, টেলিভিশন কিংবা ভিডিও গেম এখন শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। অনেক শিশুই ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগ পর্যন্ত এসব ডিভাইস ব্যবহার করে।
কিন্তু ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিনে চোখ রাখলে শিশুর মস্তিষ্ক সক্রিয় অবস্থায় থাকতে পারে। ফলে সহজে ঘুম আসতে চায় না।
তাই ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে শিশুর স্ক্রিনটাইম বন্ধ করার অভ্যাস তৈরি করা ভালো।
বাড়ির অন্য সদস্যরা যদি গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন, তাহলে শিশুর একা ঘুমাতে অনীহা তৈরি হতে পারে। ঘরের আলো, মানুষের চলাচল কিংবা কথাবার্তার শব্দও তার মনোযোগ ধরে রাখতে পারে।
তাই সম্ভব হলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘরের পরিবেশ শান্ত করে শিশুকে ঘুমানোর প্রস্তুতি দিন। পরিবারের সদস্যদেরও শিশুর ঘুমের সময়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
স্কুল বা কাজের ছুটি পেলেই অনেক পরিবার শিশুর ঘুমের সময় পরিবর্তন করে ফেলে। কোনো দিন বেশি রাত পর্যন্ত জাগা, আবার সকালে দেরি করে ওঠার অভ্যাস তৈরি হলে শিশুর স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ ব্যাহত হতে পারে।
তাই ছুটির দিনেও যতটা সম্ভব প্রতিদিনের কাছাকাছি সময়ে শিশুকে ঘুমাতে দেওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠানোর চেষ্টা করা উচিত। এতে তার শরীরের স্বাভাবিক ঘড়ি বা বডি ক্লক একটি নির্দিষ্ট ছন্দে থাকে।
বিছানায় বসে পড়াশোনা, মোবাইল দেখা, গেম খেলা, খাবার খাওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় গল্প করার অভ্যাস শিশুর ঘুমের সঙ্গে বিছানার স্বাভাবিক সম্পর্কটি দুর্বল করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, বিছানাকে মূলত ঘুমের জায়গা হিসেবেই ব্যবহার করা। এতে শিশুর মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে বিছানায় যাওয়ার সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক তৈরি করবে এবং শুয়ে পড়ার পর দ্রুত ঘুম আসতে পারে।
শিশুকে সারা দিন নানা কাজে ব্যস্ত রাখলেই রাতে সে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়বে—এমন ধারণা সবসময় ঠিক নয়। স্কুল, পড়াশোনা, টিউশন, খেলাধুলা ও অন্যান্য ব্যস্ততার পর ঘুমের আগে শিশুর মানসিকভাবে শান্ত হওয়ারও প্রয়োজন রয়েছে।
ঘুমের আগে কিছুটা নিরিবিলি সময় রাখা যেতে পারে। বই পড়া, গল্প শোনা কিংবা বাবা-মায়ের সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলা হতে পারে এর ভালো উপায়। এতে শিশু ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ পাবে।
ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে অতিরিক্ত ভারী খাবার খেলে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। আবার ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ও বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
তাই রাতে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় ও অতিরিক্ত ভারী খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার অভ্যাস করা যেতে পারে।
শিশুর বয়স অনুযায়ী ঘুমের প্রয়োজনও ভিন্ন। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন (AASM)-এর তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
অন্যদিকে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত।
পর্যাপ্ত ঘুম শুধু শিশুকে সতেজ রাখে না, তার সামগ্রিক বিকাশের সঙ্গেও এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুম পাওয়া শিশুদের মনোযোগ ও একাগ্রতা ভালো থাকে, আচরণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা বাড়ে। একই সঙ্গে স্মৃতিশক্তি ও শেখা বিষয় মনে রাখার ক্ষেত্রেও ঘুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই শিশুকে সময়মতো ঘুমানোর অভ্যাস করানোকে শুধু একটি দৈনন্দিন রুটিন হিসেবে না দেখে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা উচিত।