প্রতিদিনের খাবার শুধু ক্ষুধা মেটায় না, দীর্ঘমেয়াদে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে কিছু ধরনের ক্যান্সার, হৃদরোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং পেশির শক্তি হ্রাসের ক্ষেত্রেও খাবারের ভূমিকা আছে।
তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা মানেই খুব জটিল কোনো পরিকল্পনা নয়। বরং বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত খাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। যেসব খাবারে ভিটামিন, খনিজ, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও প্রোটিনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত আঁশ থাকে এবং বাড়তি চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বির পরিমাণ কম, সেগুলোকে পুষ্টিঘন খাবার বলা যায়।
উদ্ভিদজাত খাবারে থাকা ফাইটোনিউট্রিয়েন্টও শরীরের জন্য বাড়তি উপকারী হতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাবারে বৈচিত্র্য রাখার পাশাপাশি পুষ্টিঘন কিছু খাবার যুক্ত করা যেতে পারে। এমন কয়েকটি খাবার হলো—
বাদাম শুধু প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস নয়; এতে ভিটামিন, খনিজ, আঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের বাদামের মধ্যে আমন্ড এ ক্ষেত্রে ভালো একটি উদাহরণ।
নাশতা থেকে শুরু করে সালাদ, অ্যাপেটাইজার কিংবা ডেজার্ট—বিভিন্ন খাবারে আমন্ড যোগ করা যায়। এতে ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ফোলেট রয়েছে। মাত্র এক আউন্স আমন্ড থেকেই ভিটামিন-ই-এর দৈনিক চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পাওয়া যেতে পারে।
আমন্ডে থাকা অধিকাংশ চর্বি মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড। স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে এ ধরনের চর্বি গ্রহণ করলে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকার হতে পারে।
তবে বাদামে ক্যালোরির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তাই স্বাস্থ্যকর হলেও পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি এবং দৈনিক ক্যালোরির চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে বাদাম খাওয়া উচিত।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফলের পরিমাণ বাড়ানোর সহজ উপায়গুলোর একটি হতে পারে আপেল। বাজারে বিভিন্ন জাতের আপেল পাওয়া যায় এবং এটি সহজেই সঙ্গে নিয়ে খাওয়া যায়।
আপেল আঁশের ভালো উৎস। এর খোসায় মূলত অদ্রবণীয় আঁশ থাকে, যা পানিতে ভেঙে যায় না। অন্যদিকে আপেলের ভেতরের অংশে দ্রবণীয় আঁশ থাকে। এই আঁশ পরিপাকতন্ত্রে গিয়ে জেলের মতো গঠন তৈরি করতে পারে।
দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয়—দুই ধরনের আঁশই পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। দ্রবণীয় আঁশ হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে।
অন্যান্য উদ্ভিদজাত খাবারের মতো আপেলেও ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট রয়েছে। ভিটামিন সি ও বিভিন্ন ফ্ল্যাভোনয়েডসহ এসব উদ্ভিজ্জ উপাদান শরীরের কোষকে দৈনন্দিন বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিনস একই সঙ্গে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও আঁশের ভালো উৎস। বিভিন্ন ধরনের বিনসের পুষ্টিগুণে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও সাধারণভাবে এগুলো কম চর্বিযুক্ত প্রোটিনের উৎস হিসেবে খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নিতে পারে।
এতে থায়ামিন, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক, ফোলেট, ফসফরাস ও পটাসিয়ামের মতো বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানও পাওয়া যায়।
তরকারি, সালাদ, স্যুপ কিংবা অন্যান্য খাবারে বিনস সহজেই যোগ করা যায়। তবে অনেকের দৈনন্দিন খাবারে বিনস, মটর ও মসুর ডালের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকে।
খাদ্যতালিকায় এগুলোর পরিমাণ বাড়ানোর একটি উপায় হতে পারে বেশি চর্বিযুক্ত প্রাণিজ প্রোটিনের কিছু অংশের পরিবর্তে বিনস বা অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার রাখা।
ব্রোকলি ক্রুসিফেরাস গোত্রের সবজি এবং বাঁধাকপি পরিবারের সদস্য। এতে বিভিন্ন ধরনের ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট রয়েছে। এর মধ্যে গ্লুকোসিনোলেটস উল্লেখযোগ্য। এতে লুটেইনও রয়েছে, যা চোখের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি উদ্ভিজ্জ যৌগ।
ব্রোকলি ভিটামিন এ-এরও উৎস। সুস্থ দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখতে এই ভিটামিন গুরুত্বপূর্ণ।
শস্য, ডাল বা ডিমের সঙ্গে ব্রোকলি খেলে খাবারের পুষ্টিমান আরও বাড়তে পারে। এতে থাকা ভিটামিন সি উদ্ভিদজাত খাবার থেকে শরীরে আয়রন শোষণে সহায়তা করে।
ব্রোকলিতে ক্যালসিয়ামও পাওয়া যায়। রান্নার ক্ষেত্রেও এটি বেশ বহুমুখী—রোস্ট করে, সালাদে কুচি করে কিংবা সবজির স্যুপে দিয়ে খাওয়া যায়।
সব মিলিয়ে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে কোনো একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিঘন খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাদাম, আপেল, বিনস ও ব্রোকলির মতো খাবার সেই বৈচিত্র্য তৈরিতে সহজেই যুক্ত হতে পারে।