পা ফুলে যাওয়া অনেকের কাছেই খুব সাধারণ একটি সমস্যা। দীর্ঘক্ষণ হাঁটা, দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা আঁটসাঁট জুতা পরার পর এমনটা হলে অনেকে বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। আবার পা ফুলে গেলেই কিডনি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হন কেউ কেউ। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পা ফোলার কারণ একাধিক হতে পারে। সব ক্ষেত্রে এর সঙ্গে কিডনির সমস্যার সরাসরি সম্পর্ক থাকে না।
পায়ের টিস্যুতে অতিরিক্ত তরল জমে যে ফোলা তৈরি হয়, তাকে সাধারণভাবে এডিমা বলা হয়। এর পেছনে থাকতে পারে শিরা, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি কিংবা রক্ত জমাটের মতো বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা। এমনকি নিয়মিত ব্যবহৃত কিছু ওষুধের কারণেও পা ও গোড়ালি ফুলতে পারে।
পায়ের শিরা দিয়ে রক্ত স্বাভাবিকভাবে হৃদ্যন্ত্রের দিকে ফিরে যেতে না পারলে নিচের দিকে রক্ত জমে যেতে পারে। এ অবস্থাকে ভেনাস ইনসাফিশিয়েন্সি বলা হয়।
দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মাধ্যাকর্ষণের কারণে পায়ের নিচের অংশে রক্ত জমে চাপ বাড়তে পারে, ফলে গোড়ালি ও পায়ের পাতা ফুলে ওঠে।
হার্ট ঠিকমতো রক্ত সঞ্চালন করতে না পারলে শরীরের বিভিন্ন শিরায় চাপ বাড়তে পারে। এর ফলে রক্তনালি থেকে তরল আশপাশের টিস্যুতে বেরিয়ে গিয়ে এডিমা তৈরি করে।
এ ধরনের ফোলা সাধারণত পায়ের নিচের অংশ, গোড়ালি ও পায়ের পাতায় বেশি দেখা যেতে পারে। শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা শুয়ে থাকলে শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কিডনি শরীরের অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের করে ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে শরীরে পানি ও লবণ জমে যেতে পারে। এর প্রভাবে পা, গোড়ালি বা শরীরের অন্যান্য অংশে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে।
তবে শুধু পা ফুলেছে বলেই কিডনি রোগ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে হবে।
পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধলে ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস (DVT) হতে পারে। সাধারণত একটি পায়ে হঠাৎ ফোলা, ব্যথা, ভারী লাগা বা আক্রান্ত স্থানে উষ্ণতা অনুভূত হতে পারে।
এটি অবহেলা করার মতো সমস্যা নয়। রক্তের জমাট অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে ফুসফুসে পৌঁছালে পালমোনারি এমবোলিজম-এর মতো জীবনঝুঁকিপূর্ণ জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই হঠাৎ এক পা ফুলে গেলে বা এর সঙ্গে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যামলোডিপিন, কিছু ব্যথানাশক যেমন আইবুপ্রোফেন, ডায়াবেটিসের কিছু ওষুধ যেমন পিয়োগ্লিটাজোন এবং কিছু স্টেরয়েড এ ধরনের ফোলাভাব তৈরি করতে পারে।
তবে কোনো ওষুধের কারণে পা ফুলছে মনে হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
পা ফোলা যদি বারবার হয়, দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তাহলে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। বিশেষ করে হঠাৎ এক পা ফুলে যাওয়া, তীব্র ব্যথা, বুক ধড়ফড়, বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, পা ফোলা নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়—এটি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার একটি উপসর্গ হতে পারে। তাই অনুমানের ভিত্তিতে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।