সকাল থেকে রাত—কী খাবেন, কী পরবেন, কোন কাজটি আগে করবেন, কোন ই-মেইলের উত্তর দেবেন, কোথায় যাবেন—প্রতিদিনই আমাদের অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব, পারিবারিক বিষয় ও ব্যক্তিগত নানা পছন্দ-অপছন্দ।
একটানা সিদ্ধান্ত নিতে নিতে অনেক সময় মনের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। ফলে সহজ বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে বিরক্তি, অনীহা কিংবা দ্বিধা তৈরি হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের অবস্থাকে বলা হয় ‘ডিসিশন ফ্যাটিগ’ বা সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি।
দিনভর বারবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে তৈরি হওয়া মানসিক অবসাদ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহাকে সাধারণভাবে ডিসিশন ফ্যাটিগ বলা হয়। এটি এমন কোনো অবস্থা নয় যে মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একেবারে শেষ হয়ে গেছে। বরং দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধান্ত নিতে থাকলে মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক স্থিরতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও মানুষ কখনো তাড়াহুড়ো করতে পারেন, আবার কখনো সিদ্ধান্ত নেওয়াই এড়িয়ে যেতে পারেন।
ডিসিশন ফ্যাটিগের ক্ষেত্রে সাধারণত কয়েকটি আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন—
ছোট সিদ্ধান্তেও দ্বিধা: সাধারণ বিষয়েও কী করা উচিত তা ঠিক করতে বেশি সময় লাগতে পারে।
সিদ্ধান্ত নিতে দেরি: স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়ে যেতে পারে।
সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলা: কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে বিষয়টি পরে করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
বিরক্তি ও অধৈর্যতা: একের পর এক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সামান্য বিষয়েও বিরক্ত বা অস্থির লাগতে পারে।
বারবার সিদ্ধান্ত বদলানো: নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় বারবার মত পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
সহজ পথ বেছে নেওয়া: শুধু সিদ্ধান্তের ঝামেলা শেষ করার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় কম ভেবেই সবচেয়ে সহজ বিকল্পটি বেছে নেওয়া হতে পারে।
মানসিকভাবে নিঃশেষ লাগা: অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মস্তিষ্কে চাপ বা ক্লান্তির অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
জীবনযাত্রার নানা বিষয় সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
অতিরিক্ত ব্যস্ততা ও দীর্ঘ কর্মদিবস
একসঙ্গে অনেক দায়িত্ব সামলানো
ঘন ঘন ফোন নোটিফিকেশন ও তথ্যের চাপ
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ
একই বিষয়ে অনেকগুলো বিকল্প থাকা
বিরতি ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া
প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিখুঁত করার চেষ্টা
কাজ, মেসেজ, ই-মেইল ও অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে বারবার মনোযোগ পরিবর্তন করা
সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ মানুষের মনোযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে কি না। ২০১৮ সালে Journal of Health Psychology-তে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের দিনের বড় একটি অংশ রোগীদের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও সিদ্ধান্তের ভার তাদের মনোযোগে প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রতিদিনের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নানা সিদ্ধান্ত কখনো কখনো বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে নিজের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনীহা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে ‘ডিসিশন ফ্যাটিগ’কে মস্তিষ্কের শক্তি আক্ষরিক অর্থে শেষ হয়ে যাওয়া হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে মনোযোগ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে দুর্বল হতে পারে—এ বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলে অপ্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের সংখ্যা কমানো সম্ভব। যেমন—
আপনি যে সময়ে সবচেয়ে সতেজ ও মনোযোগী থাকেন, সে সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিন।
প্রতিদিনের পুনরাবৃত্ত কাজের জন্য নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করুন।
দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি ছোট তালিকা রাখুন।
অপ্রয়োজনীয় কাজ ও পছন্দের সংখ্যা কমিয়ে আনুন।
কাজের মাঝে নিয়মিত বিরতি নিন।
পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দেওয়ার সময় ফোন দূরে রাখুন বা নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।
প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিখুঁত হতে হবে—এমন প্রত্যাশা থেকে বেরিয়ে আসুন। অনেক ক্ষেত্রে ‘যথেষ্ট ভালো’ সিদ্ধান্তই বাস্তবসম্মত।
মানসিক ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা বা সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং কাজ, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ একই ধরনের উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, ঘুমের সমস্যা বা অন্যান্য শারীরিক-মানসিক অবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একজন চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলাই নিরাপদ।