নিয়মিত খাদ্যতালিকায় গরু, মহিষ, খাসি বা ভেড়ার মাংসের পাশাপাশি সসেজ ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত মাংস থাকলে তার প্রভাব শুধু ওজন বা হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরে বেশি পরিমাণে রেড মিট ও প্রসেসড মিট খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, মাঝেমধ্যে মাংস খেলেই ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হবে। মূল বিষয় হলো দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত ও বেশি পরিমাণে মাংস খাওয়া, বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত মাংস।
রেড মিট বলতে সাধারণত স্তন্যপায়ী প্রাণীর অপ্রক্রিয়াজাত মাংস বোঝায়। এর মধ্যে গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগলের মাংস রয়েছে। মাংসটি টাটকা, কিমা করা কিংবা হিমায়িত—যেকোনো অবস্থায় থাকতে পারে।
অন্যদিকে, প্রসেসড মিট হলো এমন মাংস, যাকে সংরক্ষণ বা স্বাদ বাড়ানোর জন্য লবণ দেওয়া, কিউরিং, গাঁজন বা ধোঁয়ায় প্রক্রিয়াজাত করার মতো পদ্ধতির মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়েছে। সসেজ, কর্নড বিফ এবং কিছু টিনজাত মাংস এ ধরনের খাবারের উদাহরণ।
শুধু গরু বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রাণীর মাংসই প্রসেসড মিট নয়। পোল্ট্রি থেকে তৈরি কোনো পণ্যও যদি কিউরিং, স্মোকিং বা এ ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, তাহলে সেটিও প্রসেসড মিটের আওতায় পড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) অধীন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (IARC) রেড মিট ও প্রসেসড মিট নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার প্রমাণ পর্যালোচনা করেছে।
IARC প্রসেসড মিটকে মানুষের জন্য ‘কার্সিনোজেনিক’ বা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এর পেছনে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে যে প্রসেসড মিট খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে রেড মিটকে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেনিক’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এর সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের সম্পর্কের কিছু প্রমাণ থাকলেও তা প্রসেসড মিটের তুলনায় কম নিশ্চিত।
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রসেসড মিট খাওয়ার পরিমাণ যত বাড়ে, সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিও সাধারণত তত বাড়তে পারে। ১০টি গবেষণার একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিদিন ৫০ গ্রাম প্রসেসড মিট খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।
রেড মিটের ক্ষেত্রে WHO জানিয়েছে, পর্যবেক্ষিত সম্পর্কটি যদি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রতিদিন ১০০ গ্রাম রেড মিট খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—এই ১৭ বা ১৮ শতাংশ হলো আপেক্ষিক ঝুঁকি। এর অর্থ এই নয় যে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাংস খেলেই কোনো ব্যক্তির ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা সরাসরি ১৭ বা ১৮ শতাংশ হয়ে যায়।
মাংস ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করতে গবেষকেরা কয়েকটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন।
কিউরিং ও স্মোকিংয়ের মতো প্রক্রিয়ায় এন-নাইট্রোসো যৌগসহ কিছু সম্ভাব্য ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হতে পারে। আবার খুব বেশি তাপমাত্রায় মাংস রান্না করার সময়ও কিছু যৌগ তৈরি হয়। বিশেষ করে গ্রিল, বারবিকিউ বা প্যান-ফ্রাই করার মতো পদ্ধতিতে হেটেরোসাইক্লিক অ্যারোমাটিক অ্যামাইন এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোমাটিক হাইড্রোকার্বন তৈরি হতে পারে।
তবে মাংসের ধরন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রান্নার পদ্ধতি এবং ক্যান্সারের ঝুঁকির মধ্যকার সম্পর্ক বেশ জটিল। এ বিষয়ে সবগুলো প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তা প্রয়োজনীয় নয়। রেড মিটে প্রোটিন, আয়রন, জিংক ও বিভিন্ন বি ভিটামিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। WHO-ও স্বীকার করে যে সঠিক খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে মাংস রাখা যেতে পারে।
মূল বিষয় হলো পরিমাণ ও খাওয়ার ধরন। বিশেষ করে প্রসেসড মিটকে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার নিয়মিত অংশ না করাই গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে। প্রসেসড মিটের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্যসহ বিভিন্ন উদ্ভিদভিত্তিক খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। এতে খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টির বৈচিত্র্যও বাড়বে।