কক্সবাজার বিমানবন্দরের নবনির্মিত টার্মিনাল আগামী সপ্তাহে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে। এর পরপরই আগামী অক্টোবরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার সরাসরি আন্তর্জাতিক আকাশপথের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের—বেবিচক—চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহ থেকে নতুন টার্মিনাল দিয়েই অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
গত বুধবার কক্সবাজার বিমানবন্দরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, বিমানবন্দরে বর্তমানে চলাচলকারী সব অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনস নতুন টার্মিনালে তাদের যাত্রী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম স্থানান্তরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে উড়োজাহাজ ও টার্মিনাল ভবনের মধ্যে যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করা হবে গলফ কার্ট। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলো এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে।
নভোএয়ারের মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগের পরিচালক সোহেল মজিদ জানান, নতুন টার্মিনাল চালুর জন্য তাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও সফলভাবে শেষ হয়েছে।
নতুন টার্মিনালে অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর আগামী মাসে কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বেবিচক চেয়ারম্যান।
বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ইতোমধ্যে টার্মিনাল নির্মাণ, রানওয়ে সম্প্রসারণসহ বেশ কিছু বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু হলে নতুন টার্মিনাল ব্যবহারের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যাত্রী ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হবে। আন্তর্জাতিক আগমন ও বহির্গমন—দুই ধরনের যাত্রীই নতুন টার্মিনাল ব্যবহার করবেন।
অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের ক্ষেত্রে হাইব্রিড ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ আগমনকারী যাত্রীরা পুরোনো টার্মিনাল ব্যবহার করবেন। আর বহির্গমনকারী যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে চেক-ইন সম্পন্ন করে পরে পুরোনো টার্মিনালে গিয়ে বোর্ডিংয়ের অপেক্ষা করবেন।
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার বৃহৎ কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের আন্তর্জাতিক টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
নতুন টার্মিনালে রয়েছে—
৪৫০ জন আন্তর্জাতিক যাত্রীর ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ডিপার্চার লাউঞ্জ
ডিউটি-ফ্রি শপ
বোর্ডিং ব্রিজ
লিফট ও এসকেলেটর
কনভেয়ার বেল্ট
চেক-ইন ডেস্ক
আগমন ও বহির্গমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার
অ্যারাইভাল লাউঞ্জ
সিসিটিভি ব্যবস্থা
ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম
পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম
লাগেজ ডেলিভারি বেল্ট
আন্তর্জাতিক বহির্গমন যাত্রীদের জন্য চারটি এবং আগমনকারী যাত্রীদের জন্য ছয়টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের লাগেজ ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে দুটি লাগেজ ডেলিভারি বেল্ট।
বিমানবন্দরের উন্নয়ন কাজ শেষ হলে বার্ষিক যাত্রী ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বর্তমানে যেখানে বছরে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রয়েছে, উন্নয়ন শেষে তা প্রায় ১৮ লাখে উন্নীত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া দুটি ওয়াইড-বডি ও তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ ধারণ করতে সক্ষম প্রায় ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের অ্যাপ্রন নির্মাণ করা হয়েছে। দুটি ট্যাক্সিওয়ের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি হলো রানওয়ে সম্প্রসারণ। আগে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ছিল ৯ হাজার ফুট। সম্প্রসারণের পর তা বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৭০০ ফুট।
এর ফলে কক্সবাজার বিমানবন্দর দেশের দীর্ঘতম রানওয়ের অধিকারী হয়েছে। রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
সম্প্রসারিত রানওয়েটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর ও বোয়িং ৭৪৭-৪০০-এর মতো ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে চীনা যৌথ উদ্যোগ সিওয়াইডব্লিউইবি-সিসিইসিসি জেভি।
বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী হওয়ায় কক্সবাজার বিমানবন্দরকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষিত রাখতেও অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ, নিরাপত্তা বেড়া, টহল সড়ক এবং ৮ হাজার ১৪৯ মিটার দীর্ঘ ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া নিরাপদ উড়োজাহাজ ওঠানামার জন্য প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং এবং ক্যাট-টু এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের আওতায় আনার ফলে দেশের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করছে সরকার।
সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের কক্সবাজার ভ্রমণ আরও সহজ হতে পারে। পাশাপাশি হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, রেস্তোরাঁসহ পর্যটননির্ভর ব্যবসায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাই নতুন টার্মিনাল ও সম্প্রসারিত রানওয়ের এই অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।