শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার ও সাংবাদিক আখতার হুসেন আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
৮১ বছর বয়সী আখতার হুসেন দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গত শুক্রবার থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তাঁর জানাজা ও দাফনের সময়সূচি পরে জানানো হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আখতার হুসেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সাংবাদিকতা, সম্পাদনা ও সাহিত্যচর্চায় যুক্ত ছিলেন। দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেছেন তিনি।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথমা প্রকাশনে পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন আখতার হুসেন। পরে অবসর নেন। সাদাসিধে জীবনযাপন এবং দীর্ঘ সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদেরও একজন ছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর লেখনী সক্রিয় ছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর লেখা এবং অজিত রায়ের সুরে তিমির নন্দীর কণ্ঠে গাওয়া ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/ আজ রুখবে তাদের কারা’ গানটি তখন ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
শিশু-কিশোরদের জন্য প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে লিখেছেন আখতার হুসেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। শিশুসাহিত্য, ছড়া ও কিশোরসাহিত্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘শিশু-বিশ্বকোষ’, ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ এবং ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’।
সাহিত্য ও শিশুসাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতি পদক, মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।
বাংলা শিশুসাহিত্যে দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তাঁর অবদান পাঠক ও সাহিত্যাঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যুতে শিশুসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের আবহ।