বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
গত ৭ মাসে বিদেশে গেছেন ৪ লাখ ৩৪ হাজার কর্মী: প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ডেঙ্গু মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ৫ লাখ কিট দিল যুক্তরাষ্ট্র : স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেনে কোনো ফি দিতে হবে না: অর্থমন্ত্রী বিনিয়োগ, এলএনজি সরবরাহ ও দক্ষতা উন্নয়নে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির বিএনপি সর্বশক্তি দিয়ে নিশ্চিত করবে আইন সবার জন্য সমান : প্রধানমন্ত্রী দেশে যৌথ অভিযানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ পিআরওভি পরীক্ষা সফল অক্টোবরে আবহাওয়ায় বড় পরিবর্তনের আভাস, মাসের শেষভাগে বাড়তে পারে বৃষ্টি এটিইউর নাম পরিবর্তন, নতুন নাম ‘স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট’ দেশে ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৯৪৮

পুঁথির পাতায় হারানো ইতিহাস খুঁজে ফিরেছেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ

ইমরোজ শাহেদ
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ নিয়ে গবেষণার কথা উঠলেই যে কয়েকজন মনীষীর নাম অনিবার্যভাবে সামনে আসে, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ তাঁদের অন্যতম। পুঁথি সংগ্রহ, পাঠোদ্ধার, সম্পাদনা ও গবেষণায় দীর্ঘ ছয় দশকের সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি শুধু অজস্র দুর্লভ পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করেননি, উন্মোচন করেছেন বাংলা সাহিত্যের বিস্মৃত এক বিশাল ভুবন।

১৮৭১ সালে জন্ম নেওয়া এই জ্ঞানসাধক জীবদ্দশাতেই মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তাঁর সংগ্রহ করা পুঁথির সূত্র ধরে সন্ধান মিলেছে বহু অজ্ঞাত কবি ও কাব্যের। পাশাপাশি এসব পাণ্ডুলিপি ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায়ও স্পষ্ট হয়েছে।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত তাঁর সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে নরোত্তম ঠাকুরের রাধিকার মানভঙ্গ, কবি বল্লভের সত্যনারায়ণের পুঁথি, দ্বিজ মাধবের গঙ্গামঙ্গল, মুক্তারাম সেনের সারদামঙ্গল এবং শেখ ফয়জুল্লাহর গোরক্ষবিজয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যাও চার শতাধিক। কবি আলাওলের পদ্মাবতী, সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল, সেকান্দরনামা ও সপ্তপয়কর—এই চার কাব্যের মোট ৭৭টি পুঁথিও তিনি সংগ্রহ করেছিলেন।

তবে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের কৃতিত্ব কেবল পুঁথি সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর অনুসন্ধানের বিস্তৃতি ছিল ইতিহাস, ভাষা, লোকসংস্কৃতি, প্রত্নতত্ত্ব, সমাজ ও ঐতিহ্য পর্যন্ত। পুঁথি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে যে অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি তিনি অর্জন করেছিলেন, তা পরবর্তী সময়ে তাঁর অন্যান্য গবেষণাকর্মেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

চট্টগ্রামের ইতিহাসে অনন্য অবদান

ইতিহাসবিষয়ক রচনার মধ্যে ইসলামাবাদ তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাঁর মৃত্যুর পর সৈয়দ মুর্তাজা আলীর সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় গ্রন্থটি। চট্টগ্রামের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ এই বইকে এ অঞ্চলের ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

চট্টগ্রামের নামের উৎপত্তি, অঞ্চলটির ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের বসতি, তীর্থস্থান, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং পর্তুগিজ, চীনা, আরবীয় ও ইংরেজসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আগমন—সবই তিনি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন সময় চট্টগ্রাম যেসব শাসকের অধীনে ছিল, তাঁদের শাসনব্যবস্থা, সামাজিক রীতি ও যুদ্ধবিগ্রহের বিবরণও পাওয়া যায় তাঁর লেখায়।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা নিয়েও তাঁর অনুসন্ধান ছিল গভীর। তিনি দেখিয়েছেন, বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের কারণে এই অঞ্চলের ভাষায় নানা ভাষার শব্দ এসে মিশেছে। মগ, পালি, আরবি, ফার্সি, উর্দু, পাহাড়ি ভাষার পাশাপাশি ইংরেজ ও ইউরোপীয় ভাষার শব্দও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকে প্রভাবিত করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। শুধু শব্দের উৎসই নয়, সেগুলোর অর্থ ও ব্যবহারিক উদাহরণও তিনি তুলে ধরেছেন।

এই কারণে ইসলামাবাদ শুধু একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ নয়; চট্টগ্রামের ভাষা, সমাজ ও সংস্কৃতিকে একসঙ্গে বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও এর মূল্য রয়েছে।

লোকসংস্কৃতির প্রতিও ছিল গভীর আগ্রহ

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের গবেষণার আরেকটি বড় ক্ষেত্র ছিল বাংলার লোকসংস্কৃতি। বঙ্গের গ্রাম্য-সাহিত্য, কয়েকটি প্রাচীন হেঁয়ালী, চট্টগ্রামী ছেলে-ভুলনা ছড়া, বাঙ্গালার মেয়েলী ব্রত, লৌকিক ব্রতবিবরণ ও প্রাচীন মুসলমানী গীত-মালা—তাঁর আগ্রহের ব্যাপ্তিরই পরিচয় বহন করে।

তিনি গ্রামবাংলার ধাঁধা, প্রবাদ, সারিগান, হেঁয়ালি, ছড়া, মেয়েলি গান ও ব্রতকথাকে নিছক বিনোদনের উপকরণ হিসেবে দেখেননি। এসবের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছেন মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস, সামাজিক রীতি ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের উপাদান।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা লোকগান, ছড়া ও হেঁয়ালির সঙ্গে তিনি চলিত বাংলায় অর্থও যুক্ত করেছেন। ফলে আঞ্চলিক ভাষায় রচিত এসব লোকসাহিত্য বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে।

ব্রতসংস্কৃতি নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনুসন্ধানী। তাঁর মতে, মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসের ক্রমবিকাশ বুঝতে এসব লোকাচার ও ব্রতের ইতিহাস সংরক্ষণ করা জরুরি। অর্থাৎ লোকসংস্কৃতির ভেতরেও তিনি খুঁজেছেন সমাজ ও মানুষের মানসিক বিবর্তনের ইতিহাস।

ঐতিহ্যকে দেখেছেন সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের গবেষণাকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনো সংস্কৃতিকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোঝা সম্ভব নয়। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা মানে সংস্কৃতির ভিত্তিকেই অস্বীকার করা।

এই বিশ্বাস থেকেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি পুরোনো পুঁথি, লোকসাহিত্য, ভাষা, ইতিহাস ও মানুষের জীবনযাত্রার নানা উপাদান অনুসন্ধান করে গেছেন। দুষ্পাঠ্য পাণ্ডুলিপির পাঠ উদ্ধার, কবি ও কাব্যের পরিচয় নির্ণয়, তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় টীকা-ভাষ্য সংযোজন—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অসাধারণ ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়।

তাই আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে শুধু একজন পুঁথি সংগ্রাহক হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানের ব্যাপ্তি অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। তিনি ছিলেন ইতিহাসের অনুসন্ধানী পাঠক, লোকসংস্কৃতির সংগ্রাহক, ভাষার গবেষক এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অন্বেষণের এক অগ্রপথিক।

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের যে বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ জগৎ আজ আমাদের কাছে অনেকটাই পরিচিত, তার পেছনে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ছয় দশকের নিরলস সাধনার অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর সংগ্রহ ও গবেষণা কেবল অতীতকে সংরক্ষণ করেনি, বরং বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর একটি শক্তিশালী পথও তৈরি করেছে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

আজকের নামাজের সময়সুচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
  • ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ
  • ১৬:০৬ অপরাহ্ণ
  • ১৭:৪৯ অপরাহ্ণ
  • ১৯:০২ অপরাহ্ণ
  • ৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ
©2026 All rights reserved
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102