পাবলো নেরুদার কাব্যজগত এতটাই বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক যে তাঁকে শুধু ‘সংগ্রামের কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করলে তাঁর সৃষ্টিশীলতার বড় একটি অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। প্রেম, রাজনীতি, ইতিহাস, ব্যক্তিজীবন, লাতিন আমেরিকার সামাজিক বাস্তবতা এবং নিপীড়িত মানুষের আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু মিলেই নির্মিত হয়েছে তাঁর অনন্য কাব্যসত্তা। সেই জটিল ও বৈচিত্র্যময় নেরুদাকে বাংলা ভাষার পাঠকের সামনে বিশ্লেষণধর্মীভাবে হাজির করেছেন আলী আনোয়ার তাঁর গ্রন্থ ‘পাবলো নেরুদা: প্রেমে ও সংগ্রামে’-তে।
বাংলাভাষী পাঠকের কাছে নেরুদার পরিচয়ের শুরু মূলত তাঁর সাম্যবাদী আদর্শ ও আন্তর্জাতিকতাবাদী ভূমিকার সূত্র ধরে। বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে মুক্তিসংগ্রামের কবি হিসেবে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে পল রোবসন, পাবলো পিকাসো, নাজিম হিকমত ও হাওয়ার্ড ফাস্টের সঙ্গে একই পরিসরে। এই পরিচয় নেরুদার ক্ষেত্রে যথার্থ হলেও তাঁর সমগ্র সাহিত্যিক সত্তাকে ধারণ করে না।
নেরুদা একই সঙ্গে ছিলেন প্রেম ও জীবনের কবি, লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের এক গভীর সাক্ষী এবং নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। আন্দেজের কৃষক, সালফার খনির শ্রমিক, প্রাচীন মাচু পিচুর সভ্যতা কিংবা মহাদেশের রাজনৈতিক সংকট—সবই তাঁর কবিতায় ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় উপস্থিত হয়েছে। ফলে নেরুদাকে বুঝতে হলে তাঁর কবিতার পাশাপাশি তাঁর জীবন ও সময়কেও পাঠ করতে হয়।
১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে নেরুদার আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়। এর দুই বছর পর, ১৯৭৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই আইলা নেগ্রায় নিজের বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়। সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের হত্যার পরপর নেরুদার প্রয়াণ তাঁর জীবন ও সাহিত্যকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে নতুন আগ্রহ তৈরি করে। তাঁর জীবনস্মৃতি এবং একের পর এক ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ লাতিন আমেরিকার সাহিত্যকে আরও বিস্তৃত পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেয়।
বাংলাদেশেও নেরুদা-চর্চার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তাঁর কবিতা বিভিন্ন সময়ে অনূদিত হয়েছে, প্রকাশিত হয়েছে সংকলন ও স্মারকগ্রন্থ। ২০০৪ সালে নেরুদার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে মীজানুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একটি স্মারকগ্রন্থ। তবে বাংলা ভাষায় নেরুদাকে নিয়ে মৌলিক ও বিস্তৃত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আলী আনোয়ারের ‘পাবলো নেরুদা: প্রেমে ও সংগ্রামে’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
২০০৭ সালে সাহিত্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার বইটিতে লেখক নেরুদার সাহিত্যকে তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে পাশাপাশি রেখে বিশ্লেষণ করেছেন। বিশেষ তাৎপর্যের বিষয় হলো, নেরুদার কবিতার যে অনুবাদগুলো বইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলোর অনেকটাই আলী আনোয়ার নিজেই করেছেন।
গ্রন্থের শুরুতেই তিনি বাংলা পাঠকের নেরুদা-পাঠে ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক প্রভাব কীভাবে বাঙালি পাঠকের সাহিত্যবোধকে ইংরেজি সাহিত্যের দিকে বেশি কেন্দ্রীভূত করেছে, সেটিও বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, ইংরেজি সাহিত্যের ‘ক্যানন’ সম্পর্কে আমাদের যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, স্পেনীয় ও অন্যান্য ইউরোপীয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে তা তৈরি হয়নি। নেরুদাকে বোঝার ক্ষেত্রে এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ।
আলী আনোয়ারের আলোচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি নেরুদার কবিতা নিয়ে শুধু তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেননি; বরং কবিতার ভাষা, আবেগ, জীবনবোধ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে একসঙ্গে বিবেচনা করেছেন। তাঁর অনুবাদ সম্পর্কেও তিনি সরলভাবে ‘হুবহু যথার্থতা’র দাবি করেননি। বরং মূল কবিতার আঙ্গিক, টানাপোড়েন ও ভাষার অস্থিরতাকে অনুবাদের মধ্যেও ধারণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
ফলে ‘পাবলো নেরুদা: প্রেমে ও সংগ্রামে’ শুধু একজন বিশ্বখ্যাত কবিকে নিয়ে লেখা জীবনী বা সমালোচনাগ্রন্থ নয়; এটি নেরুদার কবিতার ভেতরে প্রবেশের একটি পাঠ-সহায়কও। প্রেমের কবি নেরুদা এবং সংগ্রামের কবি নেরুদাকে আলাদা না করে একই সত্তার দুই দিক হিসেবে দেখার চেষ্টা রয়েছে বইটিতে।
বাংলা ভাষায় বিদেশি কবি-সাহিত্যিককে নিয়ে এমন বিস্তৃত ও মননশীল কাজের সংখ্যা খুব বেশি নয়। সেই বিবেচনায় আলী আনোয়ারের বইটি নেরুদা-চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। নেরুদাকে নতুনভাবে পড়তে আগ্রহী পাঠকের কাছে বইটি তাঁর কবিতার ভাষা, ইতিহাস ও মানবিক আকাঙ্ক্ষার দিকে যাওয়ার একটি কার্যকর দরজা খুলে দেয়।
বই: পাবলো নেরুদা: প্রেমে ও সংগ্রামে
লেখক: আলী আনোয়ার
প্রকাশনী: সাহিত্য প্রকাশ
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি, ২০০৭
মূল্য: ৪৫০ টাকা