ফেরদৌসী রহমান উপমহাদেশের কণ্ঠসংগীতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। প্রায় সাত দশক ধরে বাংলা গানকে নিজের কণ্ঠের মাধুর্যে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। শুধু শিল্পী নন, লেখক হিসেবেও তাঁর আত্মজীবনীর পরিসর ও সাহিত্যমান পাঠককে মুগ্ধ করে। তাঁর আত্মচরিত ‘লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’ যেন একই সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের স্মৃতিচারণ, সংগীতের ইতিহাস এবং একটি সময়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক দলিল।
গ্রন্থটির পরতে পরতে উঠে এসেছে শৈশবে কলের গান শোনার স্মৃতি, স্বর্ণযুগের গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও চলচ্চিত্রজগতের নানা অজানা গল্প। পারিবারিক পরিচয়ে তাঁর বাবা প্রখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ। তবে এই বইয়ের মাধ্যমে পাঠক জানতে পারেন তাঁর মা সম্পর্কেও অনেক অজানা কথা—সেতারবাদন ও সংগীতচর্চায় মায়ের অবদানের কথা। লেখিকা তাই অকপটেই স্বীকার করেছেন, তাঁর জীবনে বাবার চেয়েও মায়ের অবদান বেশি।
বইটির শুরুতেই রয়েছে পরিবারের বন্ধন, খুনসুটি ও সৃজনশীলতার নানা স্মৃতি। পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠা, বুড়িগঙ্গার তীরের জীবন, ঘোড়ার গাড়ি, পয়লা বৈশাখসহ পুরোনো ঢাকার সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের নানা ছবি লেখিকার স্মৃতিচারণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
একজন শিল্পী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে তাঁকে যে দীর্ঘ ও কঠিন প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তারও বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে বইটিতে। কামরুল হাসানের কাছে ব্রতচারী নৃত্য শেখা থেকে শুরু করে জ্ঞানেন চক্রবর্তীসহ অসংখ্য ওস্তাদের কাছে সংগীতের তালিম নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।
তারুণ্যের শুরুতেই শিল্পী হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় লাহোর ও করাচিতে রেকর্ডিংয়ের সুযোগ পান ফেরদৌসী রহমান। সেখানে তৎকালীন পাকিস্তান ও ভারতের খ্যাতিমান শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও বন্ধুত্বের স্মৃতিও উঠে এসেছে আত্মচরিতে।
বাবার সঙ্গে রেঙ্গুন ভ্রমণ, শহরটির অভিজাত ঐতিহ্য, ইউনেসকোর আমন্ত্রণে স্কলারশিপে ওস্তাদ আমির খাঁর কাছে তালিম নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঘটনা এবং পরে লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজে পাশ্চাত্য সংগীত বিষয়ে পড়াশোনার কাহিনি বইটির অন্যতম আকর্ষণ।
কাবুলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সেখানকার শাহ পরিবার ও উচ্চাঙ্গসংগীত চর্চার পরিবেশ, চেরিবাগানের স্মৃতি—সবকিছুই তিনি এমন সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন, যেন পাঠকের সামনে বসে গল্প করছেন।
এ ছাড়া সিডনির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার লোকসংগীত বিষয়ে পাঠদান, জাপানের কিয়োটো, মরিশাস, কানাডার টরন্টোসহ বিশ্বের নানা দেশে ভ্রমণ ও সংগীত পরিবেশনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে বইটিতে।
মাত্র ২৫৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার এমন বিস্তৃত সমাহার সত্যিই বিস্ময়কর। ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতির পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে লেখিকা বিভিন্ন দেশের সামাজিক, নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
গ্রন্থটির বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক, প্লেব্যাক শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা।
সহশিল্পী হিসেবে মেহেদি হাসান, আবিদা পারভিন, নূরজাহান ও ফরিদা খানমের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য ও সংগীতদক্ষতার বিশ্লেষণ করেছেন ফেরদৌসী রহমান। বিশেষ করে মেহেদি হাসানের রেওয়াজ ও সংগীতসাধনার যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, তা তরুণ শিল্পীদের জন্য হতে পারে মূল্যবান শিক্ষণীয় বিষয়।
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে এসেছে গীতিকার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আনোয়ার উদ্দিন খান, কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সুরকার সত্য সাহা, সমর দাস, চলচ্চিত্র নির্মাতা সুভাষ দত্ত, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খাঁ, শিল্পী ফিরোজা পারভীন, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, সৈয়দ আব্দুল হাদীসহ বহু গুণী মানুষের কথা।
তবে বইটি কেবল সাফল্য ও আনন্দের গল্প নয়। এর পাতায় পাতায় মাঝেমধ্যে উঠে এসেছে বিষাদ, হতাশা ও শিল্পীজীবনের নানা তিক্ত অভিজ্ঞতাও। শিল্পীদের ব্যক্তিসত্তা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং সম্পর্কের জটিলতার কথাও লেখিকা এড়িয়ে যাননি।
তাঁর ভাষায়, ‘শিল্পীরা যে ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক হয়, এটা আমরা সবাই জানি।’ এই উপলব্ধিই যেন বইটির শিরোনামকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে—‘লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’।
সব মিলিয়ে ফেরদৌসী রহমানের এই আত্মচরিত শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনের গল্প নয়; এটি বাংলা সংগীত, চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি এবং একটি বদলে যাওয়া সময়েরও স্মৃতিভাণ্ডার। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের আনন্দ-বেদনা, শিল্পী হয়ে ওঠার সাধনা এবং বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে বইটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য জীবনকথা।