সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু সবসময় শারীরিক দূরত্ব নয়। কখনো কখনো একই বাড়িতে থেকেও তৈরি হয় এমন এক অদৃশ্য দূরত্ব, যা ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয় সম্পর্কের উষ্ণতা। সকালে ঘুম থেকে ওঠা, অফিসের প্রস্তুতি, যানজট পেরিয়ে কর্মস্থলে পৌঁছানো, সারাদিনের কাজ, মিটিং, ফোনকল, ই-মেইল—সবশেষে বাড়ি ফিরেও যদি মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে অফিসের চিন্তা, তাহলে পরিবারের জন্য মনোযোগটুকু কোথায়?
শরীর হয়তো বাড়িতে, কিন্তু মন পড়ে থাকে কর্মস্থলের ব্যস্ততায়। আর এই ব্যস্ততার মধ্যেই অনেক সময় অজান্তে দূরে সরে যেতে থাকেন বাবা-মা ও সন্তান।
বিশেষ করে কর্মজীবী বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে কাজ ও পরিবারের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। সন্তান হয়তো বাবা-মায়ের সঙ্গে একই ঘরে বসে আছে, কিন্তু বাবা-মা ব্যস্ত ফোন, ল্যাপটপ কিংবা পরদিনের কাজের চিন্তায়। কথোপকথন ধীরে ধীরে কমতে কমতে একসময় শুধু প্রয়োজনীয় কথাবার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় কর্মরত অভিভাবকদের কাজ ও পরিবার সামলানোর চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ২৪২ জন কর্মরত অভিভাবকের ওপর পরিচালিত ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, কাজ ও সন্তানের দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে অনেক অভিভাবকই মানসিক চাপ অনুভব করেন।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭০ শতাংশ ফুল-টাইম কর্মরত অভিভাবক জানিয়েছেন, অফিসের কাজের মধ্যেও তাদের সন্তানের দায়িত্ব সামলাতে হয়। আবার ৫৯ শতাংশ বলেছেন, সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময়ও তাদের চাকরির কাজ করতে হয়। আরও ৫২ শতাংশ মনে করেন, তাদের চাকরি ভালো বাবা-মা হয়ে ওঠার পথে বাধা তৈরি করছে। বিপরীতে ৪৫ শতাংশ জানিয়েছেন, সন্তানের দায়িত্ব তাদের ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রভাব ফেলছে। প্রায় ৬০ শতাংশ অভিভাবক বলেছেন, সন্তানদের জন্য তারা পর্যাপ্ত সময় বের করতে পারছেন না।
কাজের কারণে স্কুলের অনুষ্ঠান, স্পোর্টস ডে কিংবা সন্তানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতেও অনেকের উপস্থিত থাকা সম্ভব হয় না। ফলে সময়ের অভাব শুধু ব্যস্ততার বিষয় থাকে না, ধীরে ধীরে সেটি সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবারের অনেক দায়িত্ব সরাসরি চোখে পড়ে না। সন্তানের স্কুলে কী হচ্ছে তার খোঁজ রাখা, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা, প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কথা মনে রাখা কিংবা বাড়ির নানা প্রয়োজনের পরিকল্পনা করার পেছনেও মানসিক শ্রম দিতে হয়।
সমীক্ষায় ৬২ শতাংশ কর্মরত মা জানিয়েছেন, চাকরি ও পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য রাখা তাদের জন্য কঠিন। বাবাদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ পরিবারের দায়িত্ব শুধু সময়ের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিকল্পনা, চিন্তা এবং সারাক্ষণের মানসিক ব্যস্ততাও।
এই প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় সময়ের পরিমাণে নয়, সময়ের মানে লুকিয়ে থাকে।
বাবা-মায়ের সঙ্গে একই বাড়িতে কয়েক ঘণ্টা থাকা আর মন দিয়ে ১৫ মিনিট কথা বলা—দুটি এক বিষয় নয়। কাজের চাপের কারণে দীর্ঘ সময় গল্প করার সুযোগ না থাকলেও অল্প সময়টুকু যদি মনোযোগ দিয়ে কাটানো যায়, তাহলে সম্পর্কের উষ্ণতা বজায় রাখা সম্ভব।
কিন্তু সেই অল্প সময়টুকুও যদি ফোন, ই-মেইল কিংবা অফিসের দুশ্চিন্তায় কেটে যায়, তাহলে বাবা-মায়ের মনে হতে পারে—সন্তান কাছে থেকেও যেন অনেক দূরে।
তবে পুরো বিষয়টিকে শুধু সন্তানের অবহেলা হিসেবে দেখলেও ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বর্তমান কর্মজীবনে প্রতিযোগিতা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কাজের অনিশ্চয়তা, কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেকের জীবনকেই কঠিন করে তুলছে।
কেউ হয়তো অফিসে সারাদিন চাপ সামলে বাড়ি ফিরছেন শুধু একটু শান্তির আশায়। কিন্তু সেই মানসিক ক্লান্তির বহিঃপ্রকাশ অনেক সময় সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর ওপরই পড়ে।
ফলে বাবা-মা ভাবছেন, সন্তান বদলে গেছে। আর সন্তান মনে মনে ভাবছে—‘আমি তো ইচ্ছা করে এমন করছি না।’ এই ভুল বোঝাবুঝির জায়গা থেকেই তৈরি হতে পারে সেই অদৃশ্য দেয়াল।
এই দেয়াল ভাঙতে সবসময় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু সময় বাবা-মায়ের জন্য রাখা যেতে পারে। সেটি হতে পারে রাতের খাবারের টেবিলে ১৫ মিনিট কিংবা ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ গল্প করা।
বাবা-মায়ের কথা মন দিয়ে শোনাও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের একই গল্প বারবার শুনতে হতে পারে, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কথা বলতে হতে পারে। বাইরে থেকে বিষয়গুলো তুচ্ছ মনে হলেও তাদের কাছে এগুলোই হয়তো দিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে বাবা-মায়েরও বোঝা প্রয়োজন, সন্তান কর্মজীবনে নানা চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই প্রতিটি ব্যস্ততাকে অবহেলা হিসেবে দেখলে সম্পর্কের চাপ আরও বাড়তে পারে।
একই ঘরে বসে সবাই যদি নিজের নিজের মোবাইলের পর্দায় তাকিয়ে থাকে, তাহলে শারীরিক দূরত্ব না থাকলেও মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। তাই দিনের অন্তত কিছুটা সময় ফোন দূরে রেখে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস করা যেতে পারে।
সপ্তাহে একদিন একসঙ্গে খাওয়া, কাছাকাছি কোথাও হাঁটতে যাওয়া, পুরোনো ছবি দেখা কিংবা কোনো পারিবারিক স্মৃতি নিয়ে গল্প করাও সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনতে পারে।
ব্যস্ততার মধ্যেও একটি ফোন, কয়েক মিনিটের গল্প, একসঙ্গে বসে এক কাপ চা কিংবা শুধু পাশে বসে থাকা—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই হয়তো বাবা-মায়ের সঙ্গে তৈরি হতে থাকা অদৃশ্য দেয়ালটি ভেঙে দিতে পারে। কারণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সবসময় অনেক সময়ের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় পাওয়া সময়টুকুতে সত্যিকারের উপস্থিত থাকার।