ফুটবলের ছন্দে মাতল মাঠ, ধনুকের টানে জেগে উঠল শেকড়ের গল্প। কোথাও গোলের উল্লাস, কোথাও লক্ষ্যভেদের উত্তেজনা—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে মুখরিত হয়ে উঠেছিল দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার ধানজুড়ি। আসিসির সাধু ফ্রান্সিসের পর্ব উপলক্ষে খেলাধুলা, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এমন মিলনমেলায় একসঙ্গে মিলেছে তরুণদের প্রাণচাঞ্চল্য আর আদিবাসী সংস্কৃতির চিরচেনা রূপ। ধানজুড়ি আদিবাসী স্পোর্টিং ক্লাবের আয়োজনে এবং ধানজুড়ি মিশনের সহযোগিতায় ১ ও ৪ অক্টোবর ধানজুড়ি কবরস্থান মাঠ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় প্রীতি ফুটবল ম্যাচ ও ঐতিহ্যবাহী ধনুক প্রতিযোগিতা। স্থানীয় বিভিন্ন এলাকার খেলোয়াড় ও ক্রীড়াপ্রেমীদের অংশগ্রহণে দুই দিনের এ আয়োজন পরিণত হয় মিলনমেলায়। খেলার মাঠে তখন প্রতিযোগিতার উত্তাপ, আবার সেই উত্তাপের মাঝেই ছিল বন্ধুত্বের হাসি। ফুটবলের প্রতিটি পাস, প্রতিটি আক্রমণ আর প্রতিটি গোল ঘিরে দর্শকদের উচ্ছ্বাস; অন্যদিকে ধনুকের ছিল টানটান উত্তেজনা—লক্ষ্যভেদে কার নিশানা কতটা নিখুঁত, তা দেখতে অপেক্ষায় ছিল উপস্থিত দর্শকরা। আয়োজকদের ভাষ্য, খেলাধুলা শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; খেলাধুলা মানুষকে কাছে আনে, তৈরি করে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন। স্থানীয় তরুণদের মাঠমুখী করা এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া চর্চাকে ধরে রাখাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঐতিহ্যবাহী ধনুক প্রতিযোগিতা। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণও ছিল এতে। ধনুকের ছিল টান, চোখে ছিল লক্ষ্য, আর প্রতিটি নিশানায় যেন ফুটে উঠছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক সংস্কৃতির গল্প। নতুন প্রজন্মের কাছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরতেই এ প্রতিযোগিতার আয়োজন বলে জানান আয়োজকরা। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধানজুড়ি মিশনের পাল-পুরোহিত ফা. মানুয়েল হেম্ভ্রম, ধানজুড়ি ধর্মপল্লীর বোর্ডিং ইনচার্জ ফা. ফাব্রিচ্চিও কালেগারি, সহকারী পাল-পুরোহিত ফা. রতন মুর্মু ও ফা. তপন দাস, ৩ নম্বর খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চিত্তরঞ্জন পাহান এবং সাপ্তাহিক বিরামপুর বার্তার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। এ ছাড়া পূর্ব ধানজুড়ির মাঞি মানুয়েল হেম্ভ্রম, মাঞি কার্লস মূর্মু, ঢাকন্দের মাঞি ঠেওটেনিয়াস সরেন, বটতলীর মাঞি পৌল সরেন, পুরাতন ধানজুড়ির মাঞ্চি কেরবিন হেম্ভ্রম, বড় নেটাশনের মাঞি ডেভিড মূর্মু এবং ছোট নেটাশনের মাঞ্চি দারুন মূর্মুসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ধানজুড়ি আদিবাসী স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি রঞ্জিত হেম্ভ্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আয়োজনে উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন ৩ নম্বর খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ফ্লাপ্রিয়াস হেম্ভ্রম, ধানজুড়ি সেন্ট ফ্রান্সিস হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক টমাস মূর্মু, মিল্টন মূর্মু, সামশন মার্ডী এবং অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য ফ্রান্সিস সরেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, ধানজুড়ির এ আয়োজন শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং খেলাধুলার মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে গড়ে উঠবে বন্ধুত্ব, বাড়বে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি। একই সঙ্গে ধনুক প্রতিযোগিতার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেকড়ের সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে ঐতিহ্যের গল্প। দিন শেষে মাঠ হয়তো নীরব হয়েছে, থেমেছে ফুটবলের দৌড় আর ধনুকের টান। কিন্তু ধানজুড়ির মানুষের মনে রয়ে গেছে একটাই বার্তা—খেলার মাঠ হোক সম্প্রীতির, আর ঐতিহ্য হোক আগামীর পথচলার শক্তি।