দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি ও ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা’ দাবি করে তিনি বলেছেন, দুর্নীতি অনুসন্ধানের নামে তাকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করা এবং গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ চালানো হচ্ছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে পদায়ন ও বদলি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে দুদকে করা সাম্প্রতিক অভিযোগ এবং কমিশনের মুখপাত্রের বক্তব্যের প্রতিবাদে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
আসিফ মাহমুদ বলেন, তার বিরুদ্ধে জনসম্মুখে যেসব অভিযোগ তুলে ধরা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। তার ভাষায়, দুদকের বর্তমান কার্যক্রমকে স্বাভাবিক অনুসন্ধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার একটি প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন, ভয় দেখানো এবং তাদের বক্তব্য থেকে বিরত রাখার যে সংস্কৃতি ছিল, বর্তমান অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে সেই ধরনের পরিস্থিতিই আবার তৈরি করা হচ্ছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পদায়ন ও বদলি-সংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরে আসিফ মাহমুদ বলেন, সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর সময়কাল নথিপত্রের মাধ্যমে তিনি ইতোমধ্যে পরিষ্কার করেছেন।
তার দাবি, যে সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটি বিএনপি সরকারের সময়ের ঘটনা। একই সঙ্গে তিনি জানান, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার প্রায় দুই মাসেরও বেশি আগে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, তিনি ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং পরদিন, অর্থাৎ ১১ ডিসেম্বর, তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়।
তার বক্তব্য, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারিখগুলো যাচাই করলেই দুদকের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার কথা ছিল। ফলে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দুদকের বর্তমান কার্যক্রমের সমালোচনা করে এনসিপির এই নেতা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তারা দুদকের সংস্কার নিয়ে প্রত্যাশা করেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কমিশন সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
তবে তার অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে দুদক সংস্কারসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করেছে এবং দলীয় পদ্ধতিতে আবার কমিশন গঠন করা হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ফের রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকতে পারছে না বলে দাবি করেন তিনি।
আসিফ মাহমুদের অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই তাকে লক্ষ্য করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এ ধরনের অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি বা যৌক্তিক কারণও নেই বলে দাবি করেন তিনি।
দুদকের মুখপাত্রের দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে আসিফ মাহমুদ বলেন, শুরুতে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়া গেছে বলে বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই বক্তব্য প্রকাশ্যে প্রত্যাহার না করে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রত্যাহার করা হয়।
তার দাবি, এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে—এ ধরনের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর সেটি প্রত্যাহারের বিষয়টি একইভাবে জনসম্মুখে জানানো হয়নি। ফলে বিষয়টি তার কাছে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ চালানোর প্রক্রিয়া বলেই মনে হয়েছে।
নিজের বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ ওঠার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, অন্য অনেক ব্যক্তি এক-দুই বা তিন মাস আলোচনায় থাকলেও তিনি প্রায় সারা বছরই আলোচনার মধ্যে থাকেন।
এর পেছনে সরকারের দায়িত্বে থাকার সময় নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে কারণ হিসেবে দেখান তিনি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, সরকারে থাকা অবস্থায় জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং নীতিগত অবস্থান নিতে গিয়ে তাকে অনেক ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান নিতে হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে ক্ষমতাশালী কিছু ব্যক্তির বিরাগভাজন হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, এখন সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে। রাজনৈতিকভাবে হয়রানির পাশাপাশি তাকে ও তার পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এর আগে দেওয়া এক প্রেস ব্রিফিংয়ের বক্তব্য নিয়েও ব্যাখ্যা দেন এনসিপির মুখপাত্র। তিনি বলেন, সেখানে দুদকের মুখপাত্রকে ‘আলটিমেটাম’ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বিষয়টি পরবর্তী সময়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন তিনি দুদককে হুমকি দিয়েছেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, দুদক একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান; প্রতিষ্ঠানটিকে হুমকি দেওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। বরং দুদকের মুখপাত্রের একটি ভুল বক্তব্যের কারণে তার যে মানহানি হয়েছে, সেটি সংশোধনের জন্যই তিনি আলটিমেটাম দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, মুখপাত্র ভুল বক্তব্য দেওয়ার পর তা প্রকাশ্যে সংশোধন না করায় একজন নাগরিক হিসেবে তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণেই তিনি বিষয়টি দ্রুত সংশোধনের দাবি জানিয়েছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং দলটির মিডিয়া উপকমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।