নিজস্ব প্রতিবেদক:
ভোটার হওয়া থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল, মনোনয়ন, নির্বাচন পরিচালনা, পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ—নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তার মতে, নির্বাচনি চক্রের প্রতিটি ধাপে নারীর অংশীদারত্ব বাড়ানো গেলে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে বিদ্যমান বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে ইউএন উইমেন ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল মাল্টি স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন অন দ্য ডেভেলপমেন্ট অব অ্যা জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি স্ট্র্যাটেজি ফর দ্য বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, দেশে নারী ভোটারের হার ৪৯ দশমিক ২৭ শতাংশ হলেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ভোটার হিসেবে নারীরা শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের জায়গায় তাদের উপস্থিতি খুবই কম।
তার মতে, এর পেছনে সামাজিক পরিবেশ, পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি, আর্থসামাজিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মানসিকতার বড় ভূমিকা রয়েছে। পরিবার থেকেই ছেলে-মেয়েদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়—নারীদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের কর্মী পর্যায়েই যদি নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যায়, তাহলে নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যাও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে।
তার ভাষায়, রাজনৈতিক দলের ৫০ শতাংশ কর্মী যদি নারী হন, তাহলে দলগুলোর জন্য মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীদের উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের একার দায়িত্ব নয়। কমিশনার, রিটার্নিং কর্মকর্তা কিংবা প্রিজাইডিং কর্মকর্তা পরিবর্তন করলেই একটি নির্বাচন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না। এ লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত ইচ্ছা, দায়িত্ববোধ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন আনোয়ারুল ইসলাম। প্রথমত, রাজনীতি খারাপ—এমন ধারণা থেকে বের হয়ে ভালো ও যোগ্য মানুষকে রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে নারীদের অধিকার ও মনোনয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ যত বাড়বে, তাদের কণ্ঠও তত শক্তিশালী হবে। এর মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পথ সহজ হবে।
নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও বৈষম্য এড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নারী কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যে সংগঠিত নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।
নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে নারী কর্মকর্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর অর্ধেক কেন্দ্রে নারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে পারলে তা হবে বড় ধরনের পরিবর্তন। পুরো অর্ধেক সম্ভব না হলেও অন্তত এ লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
নারীবান্ধব ভোটকেন্দ্র গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে নারীদের আরও বেশি উৎসাহিত করার কথাও বলেন তিনি।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, শুধু নারী অধিকার ও সমতার কথা বললে হবে না, বাস্তব কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে। দীর্ঘ কর্মজীবনে নারীর অধিকার নিয়ে নানা আলোচনা হলেও এখন বাস্তবে অংশগ্রহণ ও সমতা নিশ্চিত করার সময় এসেছে।
তার মতে, জনগণ ও ভোটার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল, মনোনয়ন প্রক্রিয়া, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী—নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নারীর অর্ধেক অংশীদারত্বের লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে।
নারীদের উত্থাপিত দাবিগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব বিষয় বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পথ খুঁজে দেখা হবে।
অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব আব্দুল হালিম, উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেনসহ কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিভিন্ন প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।