আটলান্টিক মহাসাগরে ২৭ দিন ধরে ভেসে থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি নৌকা থেকে ৪৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি ওই নৌকা থেকে পাঁচজনের মরদেহও উদ্ধারকারীরা দেখতে পেয়েছেন। নৌকাটি পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া থেকে ১২৭ জন যাত্রী নিয়ে স্পেনের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
স্পেনের সংবাদ সংস্থা ইএফই জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সময় নৌকাটিতে ৪৪ জন জীবিত ব্যক্তির সন্ধান মেলে। ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন সাগরে ভেসে থাকার সময় নৌকাটির অধিকাংশ যাত্রী মারা গেছেন। নিহতদের সংখ্যা ৮০ জনের বেশি হতে পারে। মৃতদের মধ্যে অন্তত একজন শিশু রয়েছে।
গ্রান কানারিয়ার আরগুইনেগুইন শহরের জরুরি পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, নৌকার ভেতরে থাকা পাঁচ মরদেহের মধ্যে একজন শিশু ও দুজন নারী ছিলেন। উত্তাল সমুদ্রের কারণে উদ্ধারকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে মরদেহগুলো নৌকা থেকে সরিয়ে নিতে পারেননি।
জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সবাই গাম্বিয়া ও মালির নাগরিক এবং পুরুষ বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাদের বেশ কয়েকজনের শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা গেছে। সমুদ্রের পানি পান করার কারণে অনেকের শারীরিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
স্পেনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী গার্দিয়া সিভিল জানিয়েছে, নৌকাটিতে থাকা চিহ্নগুলো ৭ আগস্ট গাম্বিয়া থেকে যাত্রা করা একটি নৌকার সঙ্গে মিলে গেছে। ওই নৌকায় ১২৭ জন যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে চারজন নারী ও একটি শিশু ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
স্প্যানিশ এনজিও কামিনান্দো ফ্রন্তেরাসের কাছেও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যে একই ধরনের তথ্য এসেছে। আরগুইনেগুইন বন্দরে রেড ক্রসের কাছে তারা জানান, একশোর বেশি যাত্রী নিয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন তারা। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় অনেক যাত্রী মারা যান বলেও তারা জানান।
উদ্ধার হওয়া তিনজনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদেরও চরম ক্লান্ত ও দুর্বল অবস্থায় পাওয়া যায়।
ইএফই জানায়, তীরে পৌঁছানোর পর পুলিশ যখন উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় নথিভুক্ত করতে বসতে বলছিল, তখন অনেকে এতটাই দুর্বল ছিলেন যে টেবিলের ওপরই ঢলে পড়েন।
সমুদ্র উদ্ধার সংস্থা সালভামেন্তো মারিতিমোর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে গ্রান কানারিয়া থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে একটি বিমান নৌকাটির অবস্থান শনাক্ত করে। পরে মধ্যরাতে উদ্ধারকারী জাহাজ গুয়ারদামার উরানিয়া সেখানে পৌঁছে নৌকাটিকে সহায়তা করে।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর জন্য পশ্চিম আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে যাত্রা এখন অভিবাসীদের অন্যতম ব্যবহৃত রুটে পরিণত হয়েছে। মরক্কো, মৌরিতানিয়া ও সেনেগালের মতো দেশগুলোতে নজরদারি বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে গাম্বিয়া থেকেও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নৌযাত্রা বাড়ছে।
তবে গাম্বিয়া থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। ছোট ও অনিরাপদ নৌযানে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে যাত্রীদের প্রবল ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। নৌকার ইঞ্জিন বিকল হওয়া, দিক হারানো, খাদ্য ও পানির সংকট, শক্তিশালী বাতাস এবং সমুদ্রস্রোত—সব মিলিয়ে যাত্রাটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের এই অভিবাসন রুটে সাম্প্রতিক সময়েও একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আগস্টের শুরুতে ১৩৩ জনকে বহনকারী একটি নৌকা কয়েক দিন সাগরে ভেসে থাকার পর উদ্ধার করা হয়। নৌকাটি গাম্বিয়া থেকে ১১ দিন আগে যাত্রা করেছিল। যাত্রীদের মধ্যে গাম্বিয়া, সেনেগাল, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া ও কোত দিভোয়ারের নাগরিক ছিলেন।
এর আগে ২২ জুলাই ১৬৫ জন যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপে পৌঁছায়। ওই যাত্রায় এক নারী মারা যান এবং ছয় মাস বয়সী শিশুসহ ১৫ জন আহত হন।
জানুয়ারির শুরুতেও গাম্বিয়ার উপকূলে একটি নৌকা ডুবে যাওয়ার পর ৯৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌকাটিতে প্রায় ২০০ জন যাত্রী ছিলেন। সে হিসাবে ওই ঘটনায়ও নিখোঁজ ও নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাগরপথে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা অব্যাহত থাকায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রাণহানিও বাড়ছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারও আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।